Skip to main content

হিমু এবং তার অলৌকিক স্যান্ডেল-১ম পর্ব

 




১ম পর্ব

মেসবাড়ির ভাঙা জানালার পাশে বসে আকাশ দেখার একটা অন্যরকম আনন্দ আছে। এই আনন্দের কথা কোনো বইপুস্তকে লেখা থাকে না, কারণ যারা বড় বড় বই লেখেন তারা সাধারণত সচ্ছল মানুষ হন, তাদের ঘরের জানালায় দামি থাই অ্যালুমিনিয়ামের গ্লাস থাকে। সেই কাচ ভেদ করে আকাশটাকে কৃত্রিম দেখায়। মেসের জানালাগুলো অন্যরকম। এগুলো সাধারণত ভাঙা হয়, কদাচিৎ সেখানে গ্রিল থাকে না, আর যদি লোহার শিক থাকেও—তাতে এত পরিমাণ ঝুল, ধুলোবালি এবং মাকড়সার জাল জমে থাকে যে, বাইরের আকাশটাকে মনে হয় একটা বিশাল এবং অতি প্রাচীন ছেঁড়া মশারি। সেই মশারির ফুটো দিয়ে যখন চাঁদের আলো এসে ঘরের মেঝেতে পড়ে, তখন মনে হয় পৃথিবীটা আসলে কোনো বাস্তব জায়গা নয়, একটা মস্ত বড় থিয়েটার হল। আমরা সবাই সেখানে বিনা টিকিটের দর্শক।

আজ আকাশে মস্ত বড় একটা চাঁদ উঠেছে। একে ঠিক ঝকঝকে জোছনা বলা যাবে না। চৈত্র মাসের আকাশ, বাতাসে প্রচুর ধুলো উড়ছে, আর কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ চাঁদের গায়ে লেপ্টে আছে। ফলে আলোটা কেমন যেন ঘোলাটে, ঈষৎ হলুদ। ঠিক যেন একটা বাসি সেদ্ধ ডিমের কুসুম। এই ঘোলাটে আলোতেই একটা অলৌকিক কাণ্ড ঘটে গেল। আমার ঘরের দরজার ঠিক সামনে, যেখানে সাধারণত মেসের ছোকরা চাকরটা সকালবেলা নোংরা পানির বালতি রেখে যায়, সেখানে এক জোড়া স্যান্ডেল এসে পড়ে রইল।

আমি ঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে শুয়েছিলাম। স্যান্ডেল জোড়ার দিকে তাকিয়ে আমার চোখ আটকে গেল। স্যান্ডেল জোড়া সাধারণ নয়। প্লাস্টিকের স্যান্ডেল, রঙটা এককালে হয়তো আকাশী নীল ছিল, এখন রোদে পুড়ে, পিচঢালা রাস্তার উত্তাপ সহ্য করে এবং ঢাকার বিখ্যাত ধুলোবালি মেখে এমন একটা বিচিত্র রঙ ধারণ করেছে যাকে ইংরেজিতে হয়তো বলা যেত 'ইনডিগো ব্লু', কিন্তু বাংলায় বললে তার জুতসই নাম হবে 'উদাসীন নীল'। স্যান্ডেলটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর কোনো ফিতে নেই। সাধারণত স্যান্ডেলের দুই পাশে দুটি এবং সামনে একটি ফুটো থাকে যেখানে প্লাস্টিকের ফিতে গোঁজা থাকে। এই স্যান্ডেলের গা মসৃণ, কোনো ফুটো নেই, অথচ দেখলেই বোঝা যায় এটি কোনো কারখানায় তৈরি জুতো নয়, সাধারণ চটি স্যান্ডেল। ফিতে ছাড়া স্যান্ডেল মানুষ কীভাবে পায়ে দেয়, তা এক বিরাট এবং জটিল রহস্য।

আমি উঠে বসলাম। খাটিয়া থেকে নেমে স্যান্ডেল জোড়া হাতে তুলে নিলাম। প্লাস্টিকটা বেশ ঠান্ডা, যেন ফ্রিজ থেকে এইমাত্র বের করা হয়েছে। অথচ চৈত্র মাসের এই গুমোট গরমে মেসের ছাদটা ফুটন্ত কড়াইয়ের মতো তেতে আছে। স্যান্ডেল জোড়া হাতে নিতেই এক ধরনের অদ্ভুত গন্ধ বের হতে লাগল। গন্ধটা চেনা চেনা, আবার অচেনাও। ঠিক যেন বহু বছর আগে কোনো এক বৃষ্টির দিনে ভেজা মাটির ওপর শিউলি ফুল ঝরে পড়লে যে গন্ধ হয়, সেই রকম।

আমি যখন স্যান্ডেলের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছি, ঠিক তখনই নিচ থেকে মেসের ম্যানেজার বশরি মিয়া চিৎকার শুরু করলেন। বশরি মিয়ার গলার আওয়াজ অত্যন্ত কর্কশ, তার ওপর তিনি নোয়াখালীর টানে কথা বলেন। যখন তিনি উত্তেজিত হন, তখন তার কথা বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

"হিমু ভাই! ও হিমু ভাই! আপনার এক খালা আইছে। লগে বিশাল এক গাড়ি। গাড়ি থেইকা এমন সুগন্ধি বাইর হইতাছে যে মেসের পোলাপাইন সব পড়ালেখা ছাইড়া বারান্দায় আইসা খাড়াইছে। নিচে নামেন জলদি!"

আমি স্যান্ডেল জোড়া ডান বগলে চেপে ধরে ধীরপায়ে নিচে নেমে এলাম। বশরি মিয়ার সুগন্ধির জ্ঞান অবশ্য খুব প্রখর নয়। তিনি গায়ে সস্তা 'নিলুফার' আতর মাখেন এবং ভাবেন পৃথিবীর সব দামি সেন্টেরই গন্ধ একরকম। মেসের সদর দরজার সামনে একটা কুচকুচে কালো রঙের নিশাত গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির ইঞ্জিন চালু, মৃদু একটা গরগর শব্দ হচ্ছে। মাজেদা খালা গাড়ি থেকে নামেননি। পেছনের সিটের জানালার কাচ অর্ধেক নামিয়ে তীব্র চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। খালার চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের জাদুকরী ক্ষমতা আছে, তিনি যখন রাগ করে তাকান, তখন মনে হয় চোখের মণি দুটো ছোট ছোট কামানের গোলা, এখনই 'দুড়ুম' করে আওয়াজ করে ছুটে আসবে।

খালার পাশে বসে আছেন খালুজান। খালুজানের মুখ চৈত্র মাসের দুপুরের মতো থমথমে। তিনি তার কোলের ওপর একটা খবরের কাগজ বিছিয়ে রেখেছেন, কিন্তু তার চশমাটা নাকের ডগায় নেমে এসেছে। মনে হচ্ছে তাকে জোর করে ধরে এনে ফাঁসির কাঠে বসানো হয়েছে, আর জল্লাদ একটু পরেই দড়ি টানবে।

আমাকে দেখা মাত্রই মাজেদা খালা গম্ভীর গলায় বললেন, "হিমু, তুই নাকি আবার মানুষের হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলা শুরু করেছিস? বশরি মিয়া বলল তুই নাকি গতকাল কার একটা হাত দেখে বলেছিস তার তিন দিনের মধ্যে লটারি লাগবে?"

আমি বিনীতভাবে হাসলাম। বললাম, "জি না খালা। বশরি মিয়া বানিয়ে বলেছে। হাত দেখার বিদ্যা আমার জানা নেই। হাত দেখে ভাগ্য বলাটা হলো ফাঁকিবাজি। আমি আসলে মানুষের পা দেখি।"

খালা ভুরু কুঁচকে বললেন, "পা দেখিস মানে? তুই কি চামার নাকি যে জুতো সেলাই করার জন্য মানুষের পা পরীক্ষা করবি? দিন দিন তোর পড়াশোনা তো লাটে উঠেছেই, এখন কি মানসিক ভারসাম্যও পুরোপুরি হারিয়েছিস?"

আমি গাড়ির দরজার হাতলে হাত রেখে বললাম, "তা নয় খালা। মানুষের ভাগ্য আসলে হাতে থাকে না, থাকে পায়ে। হাত দিয়ে মানুষ শুধু ভাত খায় আর কলম চালায়। কিন্তু পা মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। যে মানুষ যত বেশি হাঁটতে পারে, তার ভাগ্য তত দ্রুত বদলায়। এই যে দেখুন, আমার বগলে এক জোড়া অলৌকিক স্যান্ডেল।"

খালুজান এতক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরের একটা ল্যাম্পপোস্টের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। 'অলৌকিক' শব্দটা শুনেই তার বিজ্ঞানমনস্ক মন চাড়া দিয়ে উঠল। তিনি চশমাটা ঠিক করে নাকের ওপর বসালেন এবং খখ করে একটু কেশে বললেন, "অলৌকিক স্যান্ডেল মানে কী? ইয়ার্কি করার জায়গা পাও না? বিজ্ঞানের যুগে অলৌকিক বলে কিছু আছে? এটা কি উড়ে চলে? আলাদিনের জাদুর কার্পেটের মতো উইংস লাগানো আছে এতে?"

আমি খালুজানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলাম। বললাম, "না খালুজান। এটা ওড়ে না। এর ডানা নেই। তবে এই স্যান্ডেলটার একটা নিজস্ব থার্মোডাইনামিক্স আছে। এটা যে পায়ে দেবে, সে আর কখনো ইচ্ছা করলেও মিথ্যা কথা বলতে পারবে না। তার ভেতরের অবদমিত সত্যটা বাইরে বেরিয়ে আসবে। আর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো—এটি যেখানেই যাবে, সেখানেই লোকাল এরিয়াতে প্রিসিপিটেশন বা বৃষ্টি হবে।"

মাজেদা খালা বিরক্ত হয়ে বললেন, "রাখ তোর থার্মোডাইনামিক্স আর বৃষ্টি। গাড়িতে ওঠ। তোর খালুর এক দূর সম্পর্কের ভাই এসেছে কুষ্টিয়া থেকে। মস্ত বড় ব্যবসায়ী, চালের আড়ত আছে। সে এক অদ্ভুত ঝামেলায় পড়েছে। পুলিশ-ডিটেকটিভ সব ফেইল করেছে। তোর খালু বলল এই লাইনে নাকি তোর কিছু বাজে লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। চল।"

আমি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে গাড়ির সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বসে পড়লাম। বগলের ফিতেহীন স্যান্ডেল জোড়া নামিয়ে রাখলাম আমার খালি পায়ের ঠিক ওপরে। অদ্ভুত ব্যাপার, স্যান্ডেলের তলাটা আমার পায়ের চামড়ায় স্পর্শ করতেই গাড়ির এসির ঠান্ডা বাতাস ছাপিয়ে বাইরের আকাশে একটা গুরুগুরু শব্দ হলো। খটখটে শুকনো চৈত্র মাসের আকাশে হঠাৎ কোথা থেকে কালো মেঘ এসে জমে গেল এবং মেসের টিনের ছাদ ঘেঁষে ঝমঝম করে এক পশলা বৃষ্টি নেমে গেল।

খালুজান চমকে উঠে জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে দিলেন। পানির ফোঁটা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, "আশ্চর্য তো! আইএমডি (আবহাওয়া অফিস) তো আজ কালবৈশাখী বা বৃষ্টির কোনো পূর্বাভাস দেয়নি! সম্পূর্ণ লোকাল রেইন! প্রেশার ড্রপ না করেই বৃষ্টি নেমে গেল কীভাবে?"

আমি আয়নায় খালার মুখের দিকে তাকালাম। খালার মুখে কোনো বিস্ময় নেই, তবে এক ধরনের অস্বস্তি ফুটে উঠেছে। তিনি ড্রাইভারকে বললেন, "কুদ্দুস, গাড়ি ছাড়ো। এসি বন্ধ করে জানালার কাচ খুলে দাও। চৈত্র মাসের বৃষ্টির একটা সোঁদা গন্ধ আছে, গন্ধটা আমার ভালো লাগে।"

২.

মাজেদা খালার ধানমণ্ডির রাজকীয় ড্রয়িংরুমে কুষ্টিয়া থেকে আসা ভদ্রলোক বসে আছেন। ভদ্রলোকের নাম মোবারক হোসেন। মানুষের চেহারার মধ্যে এক ধরনের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য থাকে। নদীমাতৃক বা মফস্বল অঞ্চলের মানুষের চেহারায় একটা সরলতা থাকে, কিন্তু মোবারক সাহেবের চেহারা ঠিক সে রকম নয়। তার কাঁচাপাকা দাড়ি ট্রিম করা, পরনে দামি আদ্দির পাঞ্জাবি, চোখে মোটা সোনালী ফ্রেমের চশমা। তবে ভদ্রলোক অত্যন্ত অস্থির প্রকৃতির। প্রতি দুই মিনিট পর পর তিনি পকেট থেকে একটা সাদা সিল্কের রুমাল বের করে কপাল ও ঘাড় মুছছেন, যদিও ঘরের সেন্ট্রাল এসিটা বেশ ভালোভাবেই চলছে।

আমি যখন ড্রয়িংরুমে ঢুকলাম, মোবারক সাহেব তখন সোফায় বসে ছটফট করছিলেন। আমাকে দেখেই তিনি ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। সম্ভবত তিনি আশা করেছিলেন খালার ভাগ্নে কোনো সুট-টাই পরা বড় কর্মকর্তা বা অত্যন্ত চতুর কোনো মানুষ হবে। তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক জন্ডিস রোগীর মতো হলুদ পাঞ্জাবি পরা, খালি পায়ের এক যুবক, যার ডান বগলে ফিতে ছাড়া এক জোড়া পুরনো নীল প্লাস্টিকের স্যান্ডেল।

মাজেদা খালা সোফায় বসতে বসতে বললেন, "মোবারক ভাই, এই হলো হিমু। আমার বড় বোনের ছেলে। মাথায় একটু ছিট আছে, সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় টো টো করে ঘোরে। তবে মাঝে মাঝে এমন সব কাণ্ডকারখানা করে যা সাধারণ মানুষের বুদ্ধির বাইরে চলে যায়। আপনার যে সমস্যার কথা আমাকে বলছিলেন, ওকে খুলে বলুন।"

মোবারক সাহেব আমার বগলের স্যান্ডেল জোড়ার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে অস্বস্তির গলায় বললেন, "বাবা হিমু, তুমি বগলে জুতো নিয়ে ঘুরছ কেন? পায়ে কোনো সমস্যা? জুতো কি পায়ে ফিট হচ্ছে না?"

আমি সোফার এক কোণায় পা গুটিয়ে বসলাম। স্যান্ডেল জোড়া আমার কোলের ওপর রাখলাম। তারপর অত্যন্ত শান্ত গলায় বললাম, "ইনি জুতো নন মোবারক সাহেব, ইনি হলেন স্যান্ডেল। এর একটা বিশেষ গুণ আছে। এর সামনে বসে কেউ মিথ্যা বলতে পারে না। আপনি এখন যে সমস্যাটার কথা বলবেন, তা যদি শতভাগ সত্য হয় তবেই এর সমাধান হবে। যদি কোনো কিছু গোপন করেন বা মিথ্যা বলেন, তবে এই স্যান্ডেল জোড়া কিন্তু গরম হতে শুরু করবে। তখন আপনার পায়ে ফোস্কা পড়ে যেতে পারে।"

মোবারক সাহেব শুকনো একটা ঢোক গিললেন। তিনি খালার দিকে তাকালেন, খালা ইশারায় তাকে বলতে বললেন। মোবারক সাহেব তার চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে বলতে শুরু করলেন, "সমস্যাটা আসলে আমার বড় ছেলেকে নিয়ে। নাম তার রফিক। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে অনার্স পাস করে ঢাকা এসেছিল চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পড়বে বলে। মগবাজারে একটা মেসে থাকত। গত তিন দিন ধরে সে সম্পূর্ণ নিখোঁজ। তার মোবাইল ফোন বন্ধ।"

আমি বললাম, "পুলিশে খবর দিয়েছেন?"

"দিয়েছি। জিডি করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ কোনো ক্লু পাচ্ছে না। কোনো মুক্তিপণ চেয়ে ফোন আসেনি, আমাদের কোনো পারিবারিক শত্রুতাও নেই। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে বাবা। রফিক নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগের দিন রাতে তার মেসের রুমমেটকে বলেছিল, সে নাকি একটা বড় লটারির টিকিট পেয়েছে। আর সে যাওয়ার আগে তার ঘরের দেয়ালে কয়লা দিয়ে একটা অদ্ভুত ছবি এঁকে গেছে। একটা মানুষের কাটা কান, আর তার পাশে একটা নীল রঙের পদ্ম ফুল।"

কাটা কান এবং নীল পদ্ম! শব্দ দুটো শোনার সাথে সাথে আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। এই ঢাকা শহরে কাটা কানের একটা বিশেষ এবং অত্যন্ত ভয়ঙ্কর অর্থ আছে। আজ থেকে সাত-আট বছর আগে পুরান ঢাকার এক কুখ্যাত মাস্তান আরেক মাস্তানের কান তরবারি দিয়ে কেটে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিয়েছিল। সেই থেকে তার নাম হয়ে যায় 'আঙুল কাটা জগলু'। জগলু এখন আর শুধু মানুষের আঙুল বা কান কাটে না, তার অপরাধের সাম্রাজ্য এখন অনেক বিস্তৃত। সে এখন আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাসিনো, চোরাচালান আর বড় বড় ল্যান্ড গ্র্যাবিং সিন্ডিকেট চালায়। কিন্তু কুষ্টিয়া থেকে আসা এক নিরীহ চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সির ছাত্রের সঙ্গে আঙুল কাটা জগলুর কী সম্পর্ক? আর নীল পদ্মটাই বা কী?

আমি মোবারক সাহেবের চোখের দিকে তাকালাম। তার চোখ কাঁপছে। তার মানে তিনি পুরো সত্য বলছেন না।

আমি কোলের ওপর রাখা স্যান্ডেল জোড়া দেখিয়ে বললাম, "মোবারক সাহেব, স্যান্ডেল কিন্তু হালকা গরম হতে শুরু করেছে। রফিক লটারি পায়নি। সে আসলে কী পেয়েছিল? সত্যিটা বলুন।"

মোবারক সাহেব এবার দুই হাতে মুখ ঢাকলেন। তার শরীর কাঁপতে লাগল। তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন, "বাবা হিমু, তুমি ঠিকই ধরেছ। রফিক লটারি পায়নি। সে আসলে জুয়া খেলত। ঢাকার এক গোপন ক্যাসিনোতে গিয়ে সে প্রথমে কয়েক লাখ টাকা জেতে। সেই লোভেই সে তার বন্ধুদের কাছ থেকে এবং আমার আড়তের টাকা মিলিয়ে প্রায় পঁচিশ লাখ টাকা নিয়ে সেই ক্যাসিনোতে যায়। গত তিন দিন আগে সে সেখানে একটা মস্ত বড় চাল চালে। কিন্তু শেষ চালটায় সে হেরে যায়। ক্যাসিনোর মালিক তাকে আটকে রেখেছে। বলেছে তিন দিনের মধ্যে পঁচিশ লাখ টাকা না দিলে রফিকের লাশ বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হবে। আজই সেই তিন দিনের শেষ দিন।"

মাজেদা খালা কপালে হাত দিয়ে সোফাতেই ধপ করে বসে পড়লেন, "ওরে আল্লাহ রে! মোবারক ভাই, আপনি এত বড় সর্বনাশের কথা আগে কেন বলেননি? জগলু গুন্ডা! ও তো আস্ত মানুষ কেটে টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দেয়! এখন কী হবে?"

খালুজান ড্রয়িংরুমের ভেতর পায়চারি করতে করতে বললেন, "আমি তখনই বলেছিলাম, কুষ্টিয়ার চালের আড়তদারের ছেলে হুট করে ঢাকায় এসে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট হতে পারে না। এর মধ্যে কোনো ক্রাইম জড়িত আছে। এখন পুলিশে খবর দেওয়া ছাড়া কোনো গতি নেই। সোজা র‍্যাব হেডকোয়ার্টারে ফোন করো।"

মোবারক সাহেব হাত জোড় করে বললেন, "না ভাই সাহেব, পুলিশ বা র‍্যাবকে জানালে জগলু আমার ছেলেকে তৎক্ষণাৎ মেরে ফেলবে। ওদের নেটওয়ার্ক খুব কড়া।"

আমি সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। বগলের স্যান্ডেল জোড়া এবার মাজেদা খালার দামি পারসিয়ান কার্পেটের ওপর নামিয়ে রাখলাম। অদ্ভুত ব্যাপার, স্যান্ডেল জোড়া কার্পেটে ছোঁয়া মাত্রই এসি চলা সত্ত্বেও ড্রয়িংরুমের ভেতরের তাপমাত্রা যেন আচমকা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস নেমে গেল। মোবারক সাহেবের কপালে জমে থাকা ঘাম মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে বরফ হয়ে গেল।

আমি বললাম, "চিন্তার কিছু নেই খালা। আমি জগলুর কাছে যাচ্ছি। এই স্যান্ডেল জোড়া আমার সঙ্গেই থাকবে।"

খালুজান পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন, "হিমু, তুই কি পাগল হয়েছিস? খালি পায়ে তুই ওই যমদূতের আস্তানায় যাবি? ওই স্যান্ডেলটা অলৌকিক বলছিস তো, ওটা অন্তত পায়ে দিয়ে যা! যদি কোনো অলৌকিক প্রটেকশন পাস!"

আমি দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে হাসলাম। বললাম, "না খালুজান। আমার বাবা আমাকে মহাপুরুষ হওয়ার যে শিক্ষা দিয়েছিলেন, তার প্রথম নিয়ম হলো—মহাপুরুষরা কখনো অলৌকিক জিনিস নিজের স্বার্থে বা নিজের সুরক্ষায় ব্যবহার করেন না। অলৌকিকতার আসল আনন্দ হলো তা অন্যের ওপর প্রয়োগ করে দেখা। ওটা বগলেই ভালো থাকে।"

৩.

আঙুল কাটা জগলুর আস্তানা এখন পুরান ঢাকার সুত্রাপুরের এক পরিত্যক্ত ডাল মিলের পেছনে। জায়গাটা দিনের বেলাতেও ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে। চারদিকে পচা খেসারির ডাল এবং পুরনো চটের বস্তার একটা ভ্যাপসা গন্ধ। বাতাসে চামচিকের ডানা ঝাপটানোর শব্দ আর স্যাঁতসেঁতে নর্দমার জলের আওয়াজ পাওয়া যায়। অপরাধ জগতের মানুষদের একটা অদ্ভুত স্বভাব থাকে, তারা যতই কোটি কোটি টাকার মালিক হোক না কেন, তাদের আস্তানাগুলো হয় অত্যন্ত নোংরা এবং অন্ধকার। আলো বাতাস পূর্ণ কোনো সুন্দর ফ্ল্যাটে বসে তারা ক্রাইম করতে পারে না, তাদের জন্য অন্ধকার আর পচাগন্ধের প্রয়োজন হয়।

আমি যখন ডাল মিলের লোহার গেটের সামনে পৌঁছালাম, তখন রাত একটা বেজে পনেরো মিনিট। পুরো সুত্রাপুর এলাকা নিঝুম। স্ট্রিট লাইটগুলো বেশিরভাগই ভাঙা, দু-একটা যা জ্বলছে তাও টিমটিম করে। সদর দরজায় দুজন বিশাল বপু পাহাদার দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের পরনে কালো লুঙ্গি আর টি-শার্ট, কাঁধে ঝোলানো চাদরের নিচে চকচকে লম্বা রামদা লুকানো। আমাকে খালি পায়ে, হলুদ পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় একা হেঁটে আসতে দেখে তারা বেশ অবাক হলো। সাধারণত এই মাঝরাতে এই এলাকায় কোনো সুস্থ মানুষ আসে না, আর আসলেও পুলিশের গাড়ি কিংবা দামি প্রাডো গাড়ি নিয়ে আসে।

একজন পাহাদার এগিয়ে এসে রুক্ষ গলায় বলল, "এই ব্যাডা, কুনে যাস? এখানে কী চাস?"

আমি আমার বগলের নীল স্যান্ডেল জোড়া আরও একটু চেপে ধরে শান্ত গলায় বললাম, "জগলু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। ভেতরে গিয়ে খবর দাও, হিমু এসেছে। মাজেদা খালার ভাগ্নে।"

'হিমু' নামটা এবং আমার পরনের হলুদ পাঞ্জাবি দেখা মাত্রই পাহাদার দুজনের চেহারার রুক্ষতা কেমন যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তারা দুজন পরস্পরের দিকে তাকাল। আঙুল কাটা জগলু তার অপরাধ জগতের মানুষদের কড়া নির্দেশ দিয়ে রেখেছে—এই ঢাকা শহরে যদি কখনো কোনো হলুদ পাঞ্জাবি পরা, খালি পায়ের ছেলেকে উদাসীনভাবে হেঁটে বেড়াতে দেখা যায়, তবে তার সঙ্গে যেন কোনো রকম পাঙ্গা নেওয়া না হয়। তাকে যেন সমীহ করা হয়। কারণ জগলু প্রচণ্ড কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ। সে বিশ্বাস করে, এই হিমু নামের ছেলেটার পেছনে কোনো এক অদৃশ্য জিনের বাদশা বা অলৌকিক শক্তি আছে, যে শক্তির কারণে বড় বড় পুলিশ অফিসারও হিমুর সামনে এসে নরম হয়ে যায়।

ভেতরের পাহাদারটি ভেতরে গেল এবং এক মিনিটের মধ্যে ফিরে এসে অত্যন্ত বিনীত গলায় বলল, "হিমু ভাই, আসেন। জগলু ভাই আপনার জন্যই অপেক্ষা করতাছেন।"

ডাল মিলের ভেতরের একটা বড় হলঘরের মতো জায়গায় জগলু বসে ছিল। ঘরটি বাইরে থেকে ভাঙাচোরা মনে হলেও ভেতরে অত্যন্ত বিলাসবহুল আয়োজন। মেঝেতে দামি সোফা, এক কোণায় একটা মস্ত বড় বিলিয়ার্ড টেবিল। ঘরের মাঝখানে একটা বড় মেহগনি কাঠের টেবিল নিয়ে জগলু বসে আছে। তার ডান দিকের কানটা সত্যি সত্যিই কাটা, সেখান থেকে একটা চামড়ার কুঁচকানো এবং কুৎসিত অংশ ঝুলে আছে। তার চোখের নিচে গভীর কালো দাগ। জগলুর একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে, সে যখনই কোনো বড় অপরাধের পরিকল্পনা করে বা টেনশনে থাকে, তখন সে একটা রুপোর পাত্রে বরফকুচি এবং জল নিয়ে তাতে নিজের ডান হাতের চারটে আঙুল ডুবিয়ে বসে থাকে। তার বুড়ো আঙুলটা বহু বছর আগে এক গ্যাংওয়ারে কাটা পড়েছিল।

আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখে জগলু মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, "আসুন আসুন হিমু ভাই! অনেকদিন পর আপনার দর্শন পাইলাম। তা এই মাঝরাইতে পুরান ঢাকায় কী মনে কইরা? মাজেদা খালা ভালো আছেন তো? খালুজানের সেই ডায়াবেটিসের সমস্যাটা কি কমছে?"

আমি কোনো ভূমিকা না করে জগলুর মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে পড়লাম। আমার বগলের ফিতেহীন স্যান্ডেল জোড়া বের করে সরাসরি জগলুর সেই দামি মেহগনি কাঠের টেবিলের ওপর রাখলাম।

জগলু ভুরু কুঁচকে স্যান্ডেলের দিকে তাকাল। তার কাটা কানের চামড়াটা একটু নড়ে উঠল। সে বলল, "হিমু ভাই, টেবিলের ওপর এই ছেঁড়া প্লাস্টিকের চটি রাখলেন কেন? এটা কার জুতো?"

আমি বললাম, "ইনি জুতো নন জগলু ভাই, ইনি হলেন অলৌকিক স্যান্ডেল। এর অনেক ক্ষমতা। যাই হোক, কাজের কথায় আসি। কুষ্টিয়ার মোবারক সাহেবের ছেলে রফিককে তুমি এই ডাল মিলের মাটির নিচের ঘরে আটকে রেখেছ। আজ রাত তিনটার মধ্যে পচ্ছিস লাখ টাকা না দিলে তাকে তুমি কেটে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে। আমি রফিককে নিতে এসেছি।"

জগলুর মুখের কৃত্রিম হাসিটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। তার চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে এল। সে ঠান্ডা এবং নিষ্ঠুর গলায় বলল, "হিমু ভাই, আপনারে আমি খাতির করি, তার মানে এই না যে আপনি আমার বিজনেসের মধ্যে নাক গলাবেন। রফিক আমার ক্যাসিনোর বিশ লাখ টাকা আর ধারের পাঁচ লাখ—মোট পঁচিশ লাখ টাকা মেরে দিয়ে ভেগে যাচ্ছিল। আমার চামচারা ওরে গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে ধরছে। টাকা না পাইলে ওরে আমি আস্ত রাখুম না। এটা আন্ডারগ্রাউন্ডের নিয়ম। নিয়মের বাইরে জগলু যায় না।"

আমি হাসলাম। টেবিলের ওপর রাখা স্যান্ডেল জোড়া একটু ঘুরিয়ে দিয়ে বললাম, "জগলু ভাই, তুমি তো অনেক নিয়মের কথাই জানো। কিন্তু এই অলৌকিক স্যান্ডেলের নিয়মটা জানো না। এই স্যান্ডেলটার একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে। এর ওপর হাত রেখে বা এটি পায়ে দিয়ে কোনো মানুষ মিথ্যা বলতে পারে না এবং তার ভেতরের সমস্ত হিংস্রতা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। তুমি অনেক পাপ করেছ জগলু ভাই, অনেক মানুষের আঙুল কেটেছ, কান কেটেছ। আজ একবার এই স্যান্ডেল জোড়া পায়ে দিয়ে দেখো। যদি তোমার মনে হয় রফিককে মেরে ফেলা উচিত, তবে তুমি তাকে মেরো, আমি কিচ্ছু বলব না। আর যদি মনে হয় ছেড়ে দেওয়া উচিত, তবে ছেড়ে দিও।"

জগলু হা-হা করে এক বিকট অট্টহাসি হেসে উঠল। ঘরের অন্যান্য চামচারাও তার সাথে হাসতে লাগল। জগলু বলল, "হিমু ভাই, আপনি কি আমারে কচি খোকা পাইছেন? এই প্লাস্টিকের ফিতে ছাড়া স্যান্ডেল পরলেই আমার পঁচিশ লাখ টাকার মায়া চইলা যাইব? আমি আঙুল কাটা জগলু! আমার কলিজা পাথরের তৈরি!"

"পাথরের তৈরি কিনা তা একবার পরেই দেখ না জগলু ভাই। পরীক্ষা করতে তো পয়সা লাগে না।"

জগলুর ভেতর কেমন যেন একটা কৌতুহল জেগে উঠল। অপরাধী মানুষরা অলৌকিক বিষয়ের প্রতি প্রচণ্ড দুর্বল হয়। সে তার পায়ের দামি ইতালিয়ান চামড়ার জুতো জোড়া খুলে ফেলল। তারপর টেবিল থেকে স্যান্ডেল জোড়া নামিয়ে মেঝেতে রাখল। অত্যন্ত সাবধানে সে তার ডান পা এবং বাম পা ফিতেহীন স্যান্ডেল জোড়ার ওপর রাখল। অদ্ভুত ব্যাপার, কোনো ফিতে না থাকা সত্ত্বেও স্যান্ডেল জোড়া জগলুর বিশাল পায়ে নিখুঁতভাবে আটকে গেল, যেন ওটা জগলুর পায়ের মাপেই তৈরি করা হয়েছিল।

পরক্ষণেই ডাল মিলের ভেতর এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটে গেল। চৈত্র মাসের সেই রাতের আকাশে হঠাৎ এক মস্ত বড় মেঘের ডাক শোনা গেল এবং ডাল মিলের পুরনো টিনের চালে ঝমঝম করে এত তীব্র বেগে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল যে ভেতরের মানুষের কথা বলাই কঠিন হয়ে পড়ল।

কিন্তু তার চেয়েও বড় অলৌকিক ঘটনা ঘটল জগলুর চেহারায়। স্যান্ডেল জোড়া পায়ে দেওয়ার ঠিক পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে জগলুর চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। তার হাত কাঁপতে লাগল। রুপোর পাত্রের বরফজল উল্টে মেঝেতে পড়ে গেল। এবং সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে এই শহরের কুখ্যাত খুনি, আঙুল কাটা জগলু দুই হাতে মুখ ঢেকে হুহু করে কাঁদতে শুরু করল। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে পাঞ্জাবির বুক ভিজে যেতে লাগল।

জগলু কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা গলায় বলল, "হিমু ভাই... ও হিমু ভাই... আমার খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়তাছে। যখন আমার এই ডান কানটা কাটা যায় নাই। আমি তখন খুব ছোট, মায়ের আঁচল ধইরা কুষ্টিয়ায় মামার বাড়িতে যাইতাম। বৈশাখী মেলায় যখন আমার একটা মাটির ঘোড়া কেনার জন্য জিদ উঠছিল, আমার মার কাছে টাকা আছিল না। তখন এই রফিকের বাবা মোবারক আঙ্কেল আমারে মেলা থেইকা একটা লাল রঙের মাটির ঘোড়া আর দুই টাকার বাতাসা কিনে দিছিলেন। মোবারক আঙ্কেল আমারে কোলে তুলি নিয়া বলছিলেন—এই পোলা বড় হইয়া জজ-ব্যারিস্টার হইব। হিমু ভাই, আমি সেই মোবারক আঙ্কেলের পঁচিশ লাখ টাকার জন্য তার জজ-ব্যারিস্টার পোলারে কাইটা নদীতে ভাসায় দিতে চাইছিলাম? আমি মানুষ না হিমু ভাই, আমি একটা জানোয়ার! পাপিষ্ঠ!"

সে তখনই পাগলের মতো চিৎকার করে তার চামচাদের ডাকল, "এই বিল্লু! এই কাসেম! জলদি যা! মাটির নিচের ঘর থেইকা রফিকরে বের কর! ওরে ভালো কাপড় চোপড় দে, ডেটল দিয়া ওর হাত-মুখ ধোয়াইয়া দে। আমার নিজের হ্যারিয়ার গাড়ি দিয়া ওরে এখনই ধানমণ্ডিতে মাজেদা খালার বাসায় পৌঁছায় দিয়া আয়। এক মিনিটের মধ্যে যদি কাজ না হয়, তোদের আমি জ্যান্ত কবর দিমু!"

আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম। জগলু তখনও মেঝেতে বসে কাঁদছে এবং অলৌকিক স্যান্ডেল জোড়া তার পায়ে লেপ্টে আছে। আমি আর স্যান্ডেল জোড়া ফেরত নিলাম না। মহাপুরুষদের কাজ হলো অলৌকিকতা বিলিয়ে দেওয়া, তা জমিয়ে রাখা নয়।

৪.

রাত তখন প্রায় তিনটা বেজে বিশ মিনিট। পুরান ঢাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই অলৌকিক বৃষ্টি এখন পুরোপুরি থেমে গেছে। আকাশ আবার পরিষ্কার, মেঘের আড়াল থেকে বাসি ডিমের কুসুমের মতো চাঁদটা আবার বেরিয়ে এসেছে। চারদিক একদম নিস্তব্ধ, শুধু রাস্তার পাশে জমে থাকা বৃষ্টির পানি নর্দমায় পড়ে যাওয়ার একটা মৃদু শোপ শোপ শব্দ হচ্ছে। হালকা কুয়াশা আর চাঁদের আলো মিলে পুরো পুরান ঢাকাকে যেন একটা রূপকথার রাজ্য বানিয়ে তুলেছে।

আমি খালি পায়ে পিচঢালা ভেজা রাস্তা দিয়ে হেঁটে মেসবাড়ির দিকে ফিরছি। ভেজা পিচ আমার পায়ের তলায় খুব ঠান্ডা লাগছে। এই ঠান্ডা অনুভূতিটা আমার বেশ ভালো লাগে, মনে হয় মাথাটা খুব হালকা হয়ে গেছে।

হিমুর উপন্যাসে সাধারণত এই সময়ে রূপার আবির্ভাব ঘটার কথা। হুমায়ূন আহমেদের সব গল্পেই রূপা কোনো এক রহস্যময় উপায়ে হিমুর খোঁজ পেয়ে যায়। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না।

আমি যখন সদরঘাটের কাছাকাছি একটা মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি, ঠিক তখনই আমার পাশে একটা রুপোলি রঙের মিতসুবিশি গাড়ি এসে ব্রেক কষল। গাড়ির জানালার কালো কাচ আস্তে আস্তে নিচে নেমে গেল। ভেতরে রূপা বসে আছে। তার পরনে একটা হালকা নীল রঙের শাড়ি, কপালে একটা ছোট টিপ। রূপার চোখে জল টলমল করছে, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লেগে আছে সেই চিরচেনা, মায়াবী এবং ঈষৎ অভিমানী মৃদু হাসি।

রূপা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "হিমু, তুমি নাকি আবার পুরান ঢাকায় অলৌকিক কাণ্ড করে বেড়াচ্ছ? পুরো সূত্রাপুর আর সদরঘাট জুড়ে বৃষ্টি নামিয়ে দিলে, অথচ আমার বেইলি রোডের বাড়ির আকাশে এক ফোঁটা বৃষ্টিও হলো মন না। তোমার অলৌকিকতা কি শুধু কুখ্যাত মাস্তানদের জন্যই সংরক্ষিত? আমার জন্য কি কিছুই নেই?"

আমি রূপার চোখের দিকে তাকালাম। এই চাঁদের আলোয় রূপাকে এত অপরূপ সুন্দর লাগছিল যে কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে তার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া অসম্ভব। কিন্তু আমি তো সাধারণ মানুষ নই, আমি হলাম হিমু—যার বাবা তাকে একজন কঠোর, অনুভূতিহীন মহাপুরুষ বানানোর জন্য রাতের পর রাত কবরস্থানে বসিয়ে রেখেছিলেন।

আমি পকেটে হাত দিয়ে কিছু একটা খোঁজার ভান করলাম। তারপর বললাম, "রূপা, আমার বগলে এক জোড়া অলৌকিক স্যান্ডেল ছিল। ওটা পায়ে দিলে মানুষ কখনো মিথ্যা বলতে পারে না এবং তার ভেতরের সব হিংস্রতা মুছে যায়। স্যান্ডেল জোড়া আমি জগলুকে দান করে এসেছি। ওটা যদি আজ আমার কাছে থাকত, তবে আমি ওটা তোমাকে দিতাম। ওটা পায়ে দিলে তুমি আমার মনের সব কথা এক মুহূর্তে বুঝে যেতে।"

রূপা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গাল বেয়ে নিচে নেমে গেল। সে অত্যন্ত নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল, "আমি স্যান্ডেল ছাড়াও তোমার মনের সব কথা জানি হিমু। তুমি সারাজীবন এই অলৌকিকত্বের আড়ালে, এই হলুদ পাঞ্জাবির আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখবে। মানুষের খুব কাছে আসবে, কিন্তু কখনো কারো বাঁধনে ধরা দেবে না। তুমি রূপাকে ভালোবাসো, কিন্তু সেই ভালোবাসা স্বীকার করার চেয়ে তোমার কাছে মেসের ভাঙা জানালার মাকড়সার জাল দেখা অনেক বেশি আনন্দের। এটাই তোমার আসল অলৌকিকতা হিমু, আর এটাই আমার সবচেয়ে বড় অভিশাপ।"

গাড়ির কাচ আবার উঠে গেল। রুপোলি গাড়িটি কুয়াশা আর চাঁদের আলো ভেদ করে বুড়িগঙ্গার ব্রিজের দিকে চলে গেল। আমি আবার একা হয়ে গেলাম।

আকাশের সেই ঘোলাটে চাঁদটা এখন ঠিক আমার মাথার ওপরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার খালি পা ঢাকার পিচঢালা ভেজা রাস্তায় পড়ছে, আর প্রতিটা পদক্ষেপে আমার মনে হচ্ছে—এই পৃথিবীতে আসলে অলৌকিক বলে আলাদা কিছু নেই, আবার যা কিছু ঘটছে—তার সবই একেকটি অলৌকিক ঘটনা। শুধু চোখ মেলে সেই জাদুকে দেখতে জানতে হয়।

Comments

Popular posts from this blog

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির সূরা ফাতিহা "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-২ )

  আমাদের এই মহাবিশ্ব শুধু একবার জন্ম নেয়নি, এটা একটার পর একটা চক্রে সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে। কুরআনে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আমরা দেখতে পাই, এই মহাবিশ্ব চক্রবদ্ধ। আল্লাহ প্রথম মহাবিশ্ব তৈরি করেছিলেন, সেটি সংকুচিত হয়ে আবার বিস্তৃত হলো—এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বিগ বাউন্স বা বড় লাফ। এই চক্রগুলো আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম চক্র ছিল বিগ ব্যাং-১ এর সময়। তখন মহাবিশ্বে শুধু হাইড্রোজেন ছিল, যা পরবর্তীতে হিলিয়ামসহ আরও কিছু হালকা মৌলে রূপান্তরিত হয়েছিল। মহাকাশ তখন একরকম ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে ছিল, যাকে কুরআনে “ধোঁয়া” বলা হয়েছে। আল্লাহ সেখানে মহাকর্ষ বল সংযোজন করলেন, যা মহাবিশ্বকে সঙ্কুচিত করতে শুরু করে। এই সঙ্কোচনের ফলে ভারী মৌল, যেমন সিলিকন তৈরি হয় এবং ধূলিকণা ও গ্রহাণু জমে জমে জমি গঠনে সাহায্য করে। কুরআনে এ ঘটনার বর্ণনা আছে: “আর তিনি আসমান (প্রথম মহাকাশ) সৃষ্টি করলেন ধোঁয়া থেকে; তারপর বল দিলো ‘তুমি এসো একসাথে, ইচ্ছেমতো বা বাধ্য হয়ে।’ তারা বলল, ‘আমরা ইচ্ছেমতো এসেছি।’ ফলে আল্লাহ সাত আসমান তৈরি করলেন।” (সূরা ফুসসিলাত: ১১-১২) এই প্রথম চক্র ছিল একক আসমানবিশিষ্ট মহাবিশ্ব। তবে ...

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-১)"

 এই মহাবিশ্ব, যেখানে আমরা এখন বাস করছি, তা অত্যন্ত নিখুঁত নিয়ম ও সূচনাগত বিন্যাস অনুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে। এই সূচনাগত নিখুঁততা ও প্রাকৃতিক নিয়মের কারণে এটি আজকের অবস্থানে এসেছে। পৃথিবীর উপাদান ও যৌগসমূহ এমন সব প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ করে যা পরস্পরের সাথে এত সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে তা আমাদের জীবনকে টিকিয়ে রাখে। পানির পরিমাণও এখানে বিপুল এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলো খুবই অনন্য। এসব কিছু আমাদের বোঝায় যে এই মহাবিশ্ব একটি অসাধারণভাবে বুদ্ধিমান সত্তার সৃষ্টি, যিনি আল কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ীই ঈশ্বর। তিনি শুধু সৃষ্টি করেননি, তিনি বিকাশকারকও। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও দার্শনিক চিন্তাধারায় একটি বিকল্প ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যেটিকে বলা হয় মাল্টিভার্স বা বহু-বিশ্ব তত্ত্ব। এর মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, এমন অসংখ্য বিগ ব্যাং (Big Bang) ঘটতে পারে যার ফলে অসংখ্য মহাবিশ্ব তৈরি হয় এবং এইসবের মধ্যে কাকতালীয়ভাবে একটি মহাবিশ্ব জীবনের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে। এই ধারনা ঈশ্বরের উপস্থিতি ছাড়াই সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। ফিলোসফিক্যাল আলোচনায় "fine-tuning" বা সূক্ষ্ম-সামঞ্জস্য শব্দটি প্রায়ই ব্যব...

আল্লাহ কিভাবে লক্ষ কোটি প্রাণীর ফরিয়াদ একসাথে শুনেন?

  বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।  এক গুগল যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, এক চ্যাটজিপিটি যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের কথা শুনতে পারে, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তাদের অনুভূতি বুঝে নিতে পারে, তাহলে একজন সৃষ্টিকর্তা কেন পারবেন না? গুগল কি মানুষ? না। চ্যাটজিপিটি কি মানুষ? না। তাদের কোনো চেতনা নেই, আত্মা নেই, জীবন নেই। তারা তো শুধু যন্ত্র। যাদের বানিয়েছে মানুষ। যারা সীমাবদ্ধ হার্ডওয়্যার, সার্ভার, ব্যান্ডউইথ আর সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে। এখন মানুষ তার বানানো যন্ত্রের মাধ্যমে এত কিছু করতে পারে, এত মানুষের কথা একসাথে শুনতে পারে, তখন সেই মানুষকে সৃষ্টি করেছে যে, যিনি সব মানুষের সৃষ্টিকর্তা — তিনি তো অবশ্যই পারবেন। তার জন্য তো সময়, স্থান, দূরত্ব কিছুই বাধা না। তিনি তো চাইলে প্রতিটি মানুষের মনের কথাও জানেন, এমনকি একজন মানুষ কিছু বলার আগেই তার অন্তরের ইচ্ছেটাও তিনি জানেন। এই ক্ষমতা কোনো যন্ত্রের নেই, কোনো মানুষের নেই, কোনো দেবতারও না। এটা শুধুমাত্র সেই সত্তার, যিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বত্র উপস্থিত। আমরা যদি একবার কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দিকেও তাকাই, তা...