Skip to main content

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-১)"



 এই মহাবিশ্ব, যেখানে আমরা এখন বাস করছি, তা অত্যন্ত নিখুঁত নিয়ম ও সূচনাগত বিন্যাস অনুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে। এই সূচনাগত নিখুঁততা ও প্রাকৃতিক নিয়মের কারণে এটি আজকের অবস্থানে এসেছে। পৃথিবীর উপাদান ও যৌগসমূহ এমন সব প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ করে যা পরস্পরের সাথে এত সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে তা আমাদের জীবনকে টিকিয়ে রাখে। পানির পরিমাণও এখানে বিপুল এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলো খুবই অনন্য। এসব কিছু আমাদের বোঝায় যে এই মহাবিশ্ব একটি অসাধারণভাবে বুদ্ধিমান সত্তার সৃষ্টি, যিনি আল কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ীই ঈশ্বর। তিনি শুধু সৃষ্টি করেননি, তিনি বিকাশকারকও।


কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও দার্শনিক চিন্তাধারায় একটি বিকল্প ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যেটিকে বলা হয় মাল্টিভার্স বা বহু-বিশ্ব তত্ত্ব। এর মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, এমন অসংখ্য বিগ ব্যাং (Big Bang) ঘটতে পারে যার ফলে অসংখ্য মহাবিশ্ব তৈরি হয় এবং এইসবের মধ্যে কাকতালীয়ভাবে একটি মহাবিশ্ব জীবনের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে। এই ধারনা ঈশ্বরের উপস্থিতি ছাড়াই সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা।


ফিলোসফিক্যাল আলোচনায় "fine-tuning" বা সূক্ষ্ম-সামঞ্জস্য শব্দটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়, যেখানে বলা হয় মহাবিশ্বের কিছু মৌলিক ধ্রুবক, প্রাকৃতিক নিয়ম এবং প্রাথমিক অবস্থা এতটাই সুনির্দিষ্ট যে সামান্য পরিবর্তন হলেই জীবনধারণ সম্ভব হত না। কেউ বলেন, এটা নিছক কাকতালীয় ঘটনা, আবার কেউ বলেন, ভবিষ্যতের উন্নত তত্ত্ব এসব ব্যাখ্যা দিতে পারবে। আর কেউ বলেন, এটা ঈশ্বরের পরিকল্পিত সৃষ্টি।


স্থান বা মহাশূন্যতায় এমন শক্তি রয়েছে, যেমন ভ্যাকুয়াম এনার্জি বা ডার্ক এনার্জি, যার মাধ্যমে অনেকে কল্পনা করেন অসংখ্য বিগ ব্যাং-এর সম্ভাবনা। এসব বিস্ফোরণের মাধ্যমে একাধিক মহাবিশ্ব তৈরি হতে পারে, আর তার মধ্যে কাকতালীয়ভাবে একটি আমাদের মত প্রাণবান হয়েছে। কিন্তু কুরআন এরকম এলোমেলোভাবে জন্ম নেওয়া অসংখ্য মহাবিশ্বকে বোঝাতে 'আলামিন' শব্দ ব্যবহার করেনি। বরং কুরআন সূক্ষ্ম-সামঞ্জস্যকেই আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে:


"তিনি যিনি সাত আসমান সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে; দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো বৈষম্য দেখতে পাবে না…" (সূরা আল-মুলক ৬৭:৩)


এই আয়াতে বলা হয়েছে আসমানসমূহে কোনো ধরনের বৈষম্য নেই, অর্থাৎ এটি নিখুঁতভাবে সুনির্দিষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ। এই সূক্ষ্ম সামঞ্জস্য আল্লাহর কাজ।


আসমানসমূহকে তুলনা করা হয়েছে পেঁয়াজের খোসার মতো স্তরবিন্যাস বিশিষ্ট জায়গা হিসেবে, যেখানে একেকটি স্তরে অসংখ্য গ্যালাক্সি বিদ্যমান। আমরা বসবাস করছি প্রথম ও ভিতরের আসমানে। এই বিশাল ঢেউ সদৃশ স্থানগুলো গঠিত হয়েছে মহাশূন্যে গ্যালাক্সির বণ্টনের মাধ্যমে। এই বিস্তৃত আসমানগুলো পদার্থের ঘনত্বে সহায়তা করেছে, যার ফলে গ্যালাক্সি তৈরি হয়েছে, আবার সমানভাবে প্রসারণে সহায়ক হয়েছে।


এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এমন সাতটি মহাকাশীয় স্তর বা 'আসমান' রয়েছে এবং এদের প্রতিটিতেই রয়েছে গ্যালাক্সিসমূহ। এই ধারনা অন্ধভাবে বিশ্বাসের বিষয় না—বর্তমান সময়ে অনেক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণও এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।


আল্লাহ হচ্ছেন এই মহাবিশ্বের মূল রচয়িতা (ফাতির)। তিনি universe-এর জন্য প্রাথমিক আইনের such configuration ঠিক করেছেন যাতে করে এটি নির্ধারিতভাবে বিকশিত হতে পারে। আজকের আধুনিক যন্ত্রপাতি, যেমন James Webb Space Telescope এর মাধ্যমে আমরা অতীতের universe-এর সেই সূচনাগত ঘটনাগুলো দেখতে পাচ্ছি।


“...তুমি আবারও চেয়ে দেখো, কোনো ত্রুটি দেখতে পাও? তারপর আবারও দৃষ্টিপাত করো, দৃষ্টি ফিরে আসবে ক্লান্ত ও অপারগ হয়ে।” (সূরা আল-মুলক ৬৭:৩-৪)


এখানে 'ফুতুরিন' শব্দটি অনেক সময় 'ত্রুটি' হিসেবে অনুবাদ করা হয়, কিন্তু এর প্রকৃত মানে হচ্ছে ‘আদি সৃষ্টির কাজ’। আল্লাহর এক নাম 'ফাতির' অর্থাৎ যিনি আদিতে সৃষ্টি করেন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আয়াতে বলা হয়েছে, তুমি সেই আদি সৃষ্টির কোনো ভুল দেখতে পারবে না।


সূর্য, পৃথিবী ও চন্দ্রের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয় এই সূক্ষ্ম সামঞ্জস্য:


“আর চন্দ্রকে আমি কক্ষে (ফালাক) চালনা করছি, যতক্ষণ না সে পুরনো শুকনো খেজুর ডালের মতো হয়ে যায়। সূর্য চাঁদকে ধরতে পারে না, রাতও দিনকে অতিক্রম করতে পারে না; সবাই একটি নির্ধারিত কক্ষে চলছে।” (সূরা ইয়াসিন ৩৬:৩৯-৪০)


এখানে 'ফালাক' শব্দের অর্থ কক্ষপথ হলেও এর অর্থ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক অর্থে 'গ্যালাক্সি'ও হতে পারে। সূর্য ও চাঁদ 'ফালাক' বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ভেতরে সাঁতরে চলেছে। চন্দ্র একটি প্রাকৃতিক ক্যালেন্ডার হিসেবে কাজ করে আসছে বহুদিন ধরে। এর আকার এমনভাবে নির্ধারিত হয়েছে যাতে এটি মানুষের জন্য সময় নির্ধারণে উপযোগী হয়। কিন্তু একইসাথে সূর্যের মহাকর্ষ শক্তি এমন একটি বড় চাঁদকে নিজের উপগ্রহ বানিয়ে নিতে পারত। এই সমস্যার সমাধান হয়েছে চাঁদের ভর কমিয়ে। ফলে সূর্য চাঁদকে ছিনিয়ে নিতে পারে না।


চাঁদের ভর এতটাই সুনির্দিষ্ট যে পৃথিবীর ২৩.৫ ডিগ্রি হেলনের ভারসাম্য বজায় রাখে, যা দিন ও রাতের ভারসাম্য রক্ষা করে। আবার এই চাঁদের সুনির্দিষ্ট ভরের কারণে সমুদ্রে নিয়ন্ত্রিত জোয়ারভাটা হয়। সূর্য-পৃথিবী-চাঁদের ভর, দূরত্ব, কক্ষপথ, গতি—সবকিছু এত সুন্দরভাবে নির্ধারিত যে সাগরে নৌকা চলতে পারে নিরাপদে।


নূহ (আঃ)-এর তরী উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “এবং আমি তাদের বংশধরদের নিয়ে বোঝাই নৌকায় বহন করেছি। এবং আমি তাদের জন্য অনুরূপ যানবাহন সৃষ্টি করেছি যার উপর তারা আরোহণ করে।” (সূরা ইয়াসিন ৩৬:৪১-৪২)


নূহ (আঃ)-এর নৌকা একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে ভেসেছিল, যেটা বোঝায় যে আল্লাহ সবকিছু নির্ধারণ করলেও তিনিই চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণে আছেন। এই সূক্ষ্ম সামঞ্জস্য আল্লাহর হস্তক্ষেপকে অস্বীকার করে না, বরং তাঁর প্রজ্ঞা ও সর্বজ্ঞানতাকে প্রমাণ করে।


অতএব, এই finely-tuned মহাবিশ্বই ঈশ্বরের অস্তিত্বের জোরালো প্রমাণ। কিন্তু একজন নাস্তিক এই সৃষ্টি দেখতে পায় না; সে এই সূক্ষ্ম সামঞ্জস্যের পরিবর্তে মাল্টিভার্স তত্ত্বকে গ্রহণ করে। তার মতে, অনেক বিগ ব্যাং আর অনেক মহাবিশ্বের মধ্যে একটি কাকতালীয়ভাবে জীবনের জন্য উপযোগী হয়েছে।


“যদি অসীম সংখ্যক মহাবিশ্ব থাকে, প্রতিটির নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক নিয়ম থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে কিছুতে (যদিও খুব অল্প সংখ্যক) এমন উপযুক্ত শর্ত থাকবে যাতে পদার্থ, গ্যালাক্সি, উপাদানগত বৈচিত্র্য, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরি হবে, এবং সেগুলো জীবনের বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত সময় পর্যন্ত টিকে থাকবে।” (উইকিপিডিয়া / Anthropic Principle)


তবে, বাস্তবতা হচ্ছে—শূন্য স্থান যতই শক্তি বহন করুক না কেন, এলোমেলো বিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমে এমন একটি মহাবিশ্ব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি। উপরন্তু, একাধিক মহাবিশ্ব থাকলে, সেগুলোর মহাকর্ষীয় টানে একে অপরের সাথে ধাক্কা লাগত এবং শুধু বিস্ফোরণই ঘটত, যদি না আলাদা আলাদা বাধা বা Barzakh থাকত।


কুরআনে 'আলামিন' শব্দটি দিয়ে এলোমেলোভাবে জন্ম নেওয়া অনন্ত সংখ্যক মহাবিশ্ব বোঝানো হয়নি। বরং বলা হয়েছে আল্লাহ বিভিন্ন universe সৃষ্টি করেছেন। যেমন, আমাদের universe-এর ভিতরে একটি সমান্তরাল universe আছে যেটি anti-matter বা dark matter দিয়ে গঠিত। সেখানেই জিন জাতির বসবাস। তারা বুদ্ধিমান এবং anti-creatures দুনিয়ার শীর্ষে।


তাই আমাদের universe একপ্রকার 'two-in-one universe'। আল্লাহ এমন ব্যবস্থাও করেছেন যাতে matter ও anti-matter এলোমেলোভাবে সংঘর্ষে না জড়ায়। এছাড়া আরও অনেক universe রয়েছে যেমন জান্নাতসমূহ, যা আমাদের universe-এর বাইরের জগতে অবস্থিত এবং Barzakh নামক এক বিশাল প্রতিবন্ধক দ্বারা পৃথক।




ওস্তাদ লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাকারিয়া কামাল চাচার সাইন্টিফিক তাফসীরুল কুরআন এর অনুপ্রেরণায় সূরা ফাতেহার রব্বুল আলামিন শব্দের উপর আজকের টপিক পর্ব এক :


সোহেল রানা 

Comments

Popular posts from this blog

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির সূরা ফাতিহা "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-২ )

  আমাদের এই মহাবিশ্ব শুধু একবার জন্ম নেয়নি, এটা একটার পর একটা চক্রে সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে। কুরআনে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আমরা দেখতে পাই, এই মহাবিশ্ব চক্রবদ্ধ। আল্লাহ প্রথম মহাবিশ্ব তৈরি করেছিলেন, সেটি সংকুচিত হয়ে আবার বিস্তৃত হলো—এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বিগ বাউন্স বা বড় লাফ। এই চক্রগুলো আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম চক্র ছিল বিগ ব্যাং-১ এর সময়। তখন মহাবিশ্বে শুধু হাইড্রোজেন ছিল, যা পরবর্তীতে হিলিয়ামসহ আরও কিছু হালকা মৌলে রূপান্তরিত হয়েছিল। মহাকাশ তখন একরকম ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে ছিল, যাকে কুরআনে “ধোঁয়া” বলা হয়েছে। আল্লাহ সেখানে মহাকর্ষ বল সংযোজন করলেন, যা মহাবিশ্বকে সঙ্কুচিত করতে শুরু করে। এই সঙ্কোচনের ফলে ভারী মৌল, যেমন সিলিকন তৈরি হয় এবং ধূলিকণা ও গ্রহাণু জমে জমে জমি গঠনে সাহায্য করে। কুরআনে এ ঘটনার বর্ণনা আছে: “আর তিনি আসমান (প্রথম মহাকাশ) সৃষ্টি করলেন ধোঁয়া থেকে; তারপর বল দিলো ‘তুমি এসো একসাথে, ইচ্ছেমতো বা বাধ্য হয়ে।’ তারা বলল, ‘আমরা ইচ্ছেমতো এসেছি।’ ফলে আল্লাহ সাত আসমান তৈরি করলেন।” (সূরা ফুসসিলাত: ১১-১২) এই প্রথম চক্র ছিল একক আসমানবিশিষ্ট মহাবিশ্ব। তবে ...

আল্লাহ কিভাবে লক্ষ কোটি প্রাণীর ফরিয়াদ একসাথে শুনেন?

  বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।  এক গুগল যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, এক চ্যাটজিপিটি যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের কথা শুনতে পারে, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তাদের অনুভূতি বুঝে নিতে পারে, তাহলে একজন সৃষ্টিকর্তা কেন পারবেন না? গুগল কি মানুষ? না। চ্যাটজিপিটি কি মানুষ? না। তাদের কোনো চেতনা নেই, আত্মা নেই, জীবন নেই। তারা তো শুধু যন্ত্র। যাদের বানিয়েছে মানুষ। যারা সীমাবদ্ধ হার্ডওয়্যার, সার্ভার, ব্যান্ডউইথ আর সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে। এখন মানুষ তার বানানো যন্ত্রের মাধ্যমে এত কিছু করতে পারে, এত মানুষের কথা একসাথে শুনতে পারে, তখন সেই মানুষকে সৃষ্টি করেছে যে, যিনি সব মানুষের সৃষ্টিকর্তা — তিনি তো অবশ্যই পারবেন। তার জন্য তো সময়, স্থান, দূরত্ব কিছুই বাধা না। তিনি তো চাইলে প্রতিটি মানুষের মনের কথাও জানেন, এমনকি একজন মানুষ কিছু বলার আগেই তার অন্তরের ইচ্ছেটাও তিনি জানেন। এই ক্ষমতা কোনো যন্ত্রের নেই, কোনো মানুষের নেই, কোনো দেবতারও না। এটা শুধুমাত্র সেই সত্তার, যিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বত্র উপস্থিত। আমরা যদি একবার কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দিকেও তাকাই, তা...