Skip to main content

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির সূরা ফাতিহা "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-২ )

 


আমাদের এই মহাবিশ্ব শুধু একবার জন্ম নেয়নি, এটা একটার পর একটা চক্রে সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে। কুরআনে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আমরা দেখতে পাই, এই মহাবিশ্ব চক্রবদ্ধ। আল্লাহ প্রথম মহাবিশ্ব তৈরি করেছিলেন, সেটি সংকুচিত হয়ে আবার বিস্তৃত হলো—এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বিগ বাউন্স বা বড় লাফ। এই চক্রগুলো আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি।

প্রথম চক্র ছিল বিগ ব্যাং-১ এর সময়। তখন মহাবিশ্বে শুধু হাইড্রোজেন ছিল, যা পরবর্তীতে হিলিয়ামসহ আরও কিছু হালকা মৌলে রূপান্তরিত হয়েছিল। মহাকাশ তখন একরকম ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে ছিল, যাকে কুরআনে “ধোঁয়া” বলা হয়েছে। আল্লাহ সেখানে মহাকর্ষ বল সংযোজন করলেন, যা মহাবিশ্বকে সঙ্কুচিত করতে শুরু করে। এই সঙ্কোচনের ফলে ভারী মৌল, যেমন সিলিকন তৈরি হয় এবং ধূলিকণা ও গ্রহাণু জমে জমে জমি গঠনে সাহায্য করে।

কুরআনে এ ঘটনার বর্ণনা আছে:

“আর তিনি আসমান (প্রথম মহাকাশ) সৃষ্টি করলেন ধোঁয়া থেকে; তারপর বল দিলো ‘তুমি এসো একসাথে, ইচ্ছেমতো বা বাধ্য হয়ে।’ তারা বলল, ‘আমরা ইচ্ছেমতো এসেছি।’ ফলে আল্লাহ সাত আসমান তৈরি করলেন।” (সূরা ফুসসিলাত: ১১-১২)

এই প্রথম চক্র ছিল একক আসমানবিশিষ্ট মহাবিশ্ব। তবে সময়ের সাথে সঙ্কোচন ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং সেটি বিগ বাউন্সে পৌঁছায়। তারপর শুরু হয় দ্বিতীয় চক্র, যেখানে সাতটি আসমানের মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়। এখানে গ্যালাক্সি ও তারকার জন্ম হয়, এবং ভারী মৌলগুলো যেমন লোহা, সোনা, সিলিকনের চেয়েও ভারী মৌল নক্ষত্রের ভেতর তৈরি হয়।

দ্বিতীয় চক্রের এই মহাবিশ্ব আমাদের বর্তমান মহাবিশ্ব। এটি বিস্তৃত হতে থাকে। এই মহাবিশ্বের গঠন এমন যে, ধূলিকণা ও গ্যাস থেকে গ্যালাক্সি তৈরি হয়, গ্যালাক্সির ভেতর তারকা ও গ্রহ জন্ম নেয়।

কিন্তু এই মহাবিশ্বেরও শেষ আছে। পরবর্তী, তৃতীয় চক্রে আবার এই মহাবিশ্ব সংকুচিত হয়ে ধ্বংস হবে—এই ঘটনাকে বিগ ক্রাঞ্চ বলা হয়। এরপর কিয়ামত ও হিশাব-নিকাশের পর, আল্লাহ নতুন মহাবিশ্ব সৃষ্টি করবেন, বিগ ব্যাং-২ এর মাধ্যমে।
কুরআনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে:

“সেদিন আমি আসমানগুলোকে গুটিয়ে নেব, যেমন গুটিয়ে নেওয়া হয় লিপির জন্য কাগজ; যেমন আমি প্রথম সৃষ্টি শুরু করেছিলাম, তেমনি পুনরায় সৃষ্টি করব।” (সূরা ইনফিতর: ১০৪)

তৃতীয় চক্রে যারা কাফির বা অবাধ্য থাকবে, তারা গ্যালাক্সিগুলোর মাঝে ছড়িয়ে পড়বে, যা হবে তাদের জন্য জাহান্নামের আগুন।


এই মহাবিশ্বের বাইরেও আল্লাহর সৃষ্টি আছে। জান্নাত বা স্বর্গ একটি সম্পূর্ণ আলাদা মহাবিশ্ব। কুরআনে জান্নাতের প্রস্থ এই মহাবিশ্বের সমান বলে উল্লেখ আছে:

“যিনি তোমাদের জন্য জান্নাত তৈরি করেছেন, যার প্রস্থ আসমান ও জমিনের সমান।” (সূরা আল ইমরান: ১৩৩)

দুইটি সমান প্রস্থের জিনিস একে অপরের মধ্যে থাকতে পারে না, তাই জান্নাত ও এই মহাবিশ্ব একে অপরের থেকে আলাদা। বাইবেলও এই ধারণা দেয়, যেখানে বলা হয়েছে, ঈশ্বর দুটি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন।


আরও প্রমাণ আছে যে, জান্নাত ও আমাদের মহাবিশ্ব আলাদা আলাদা:

১. উৎপত্তিতে পার্থক্য:
আমাদের মহাবিশ্ব বিগ ব্যাং থেকে সৃষ্টি হলেও, জান্নাত অন্য কোনও প্রক্রিয়ায় আলাদা ভাবে সৃষ্টি হয়েছে।

২. ভিন্ন ভবিষ্যৎ:
আমাদের মহাবিশ্ব ধ্বংসের মুখে, জান্নাত চিরস্থায়ী। কুরআনে উল্লেখ আছে, আমাদের মহাবিশ্বের আসমান একদিন গুটিয়ে নেয়া হবে, কিন্তু জান্নাত থাকবে চিরকাল।

৩. প্রকৃতিগত পার্থক্য:
এই মহাবিশ্ব অত্যন্ত অস্থির, সহিংস, বিপজ্জনক বিকিরণ ও বিস্ফোরণে পূর্ণ। এখানে সবকিছুই পরিবর্তনশীল। কিন্তু জান্নাত শান্তিপূর্ণ ও চিরসবুজ, যেখানে মৃত্যু বা বয়স বৃদ্ধির কোনো ধারণা নেই।

৪. জিন ও মানুষের আবাস:
আমাদের মহাবিশ্বে বেশির ভাগ অংশ ডার্ক ম্যাটার দিয়ে পূর্ণ, যেটা আমরা দেখতে বা অনুভব করতে পারি না। এই ডার্ক ম্যাটার থেকে জিন তৈরি, যারা আমাদের মহাবিশ্বেরই অধিবাসী। অন্যদিকে মানুষ মূলত জান্নাতের জন্য সৃষ্টি।


আরশ আল্লাহর এক বিশেষ স্থান, যা সব মহাবিশ্বের বাইরেই অবস্থিত। কুরআনে আরশ ও কুরসীর উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে, আরশ আমাদের মহাবিশ্বের অনেক অনেক বড়। সেখানে অনেক ফেরেশতা কর্মরত থাকে এবং এটি আল্লাহর হেডকোয়ার্টার।


সুপার স্পেস ও বারযাখ
আরশ ব্যতীত সব সৃষ্টি সুপার স্পেসে অবস্থিত। সুপার স্পেস দুই ভাগে বিভক্ত—পূর্বাঞ্চলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয়, যাদের মধ্যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বাধা বা ব্যারিয়ার আছে, যাকে বলা হয় বারযাখ। বারযাখ এমন এক স্থান যেখানে পদার্থ টিকে থাকতে পারে না, তবে আলো চলাচল করতে পারে। এই ব্যারিয়ার ছাড়া এক মহাবিশ্ব থেকে অন্য মহাবিশ্বে যাওয়া সম্ভব নয়।

আমাদের মহাবিশ্ব পূর্বাঞ্চলীয় সুপার স্পেসে, আর জান্নাত পশ্চিমাঞ্চলীয় সুপার স্পেসে অবস্থিত।


আরাফ, চ্যানেল, ও সিদরাতুল মুনতাহা
আরশের নিচে একটি বিশাল ভূমি—আরাফ নামে পরিচিত। এটি দুই ভাগে বিভক্ত, পূর্ব আরাফ এবং পশ্চিম আরাফ। পূর্ব আরাফ আমাদের মহাবিশ্বের সাথে, আর পশ্চিম আরাফ জান্নাতের সাথে যুক্ত।

সিদরাতুল মুনতাহা আরাফের উপর ঝুলছে, একটি গাছের মতো যার দুটি শাখা আছে—একটি পূর্ব আরাফের সাথে যুক্ত, আরেকটি পশ্চিম আরাফের সাথে। এটি মহাবিশ্বের যোগাযোগের কেন্দ্র, যা আল্লাহ ও ফেরেশতাদের আদেশ ও তথ্য আদান-প্রদান করে।

নবী করিম (সা.) তাদের মিরাজে এসব চ্যানেল ও সিদরাতুল মুনতাহার মাধ্যমে বিভিন্ন জগতের ভ্রমণ করেন।


ইলিয়্যিন ও সিজ্জিন
বারযাখের ভেতর দুটি হোলোগ্রাফিক জগৎ আছে—ইলিয়্যিন ও সিজ্জিন।
ইলিয়্যিন সেই স্থান যেখানে জান্নাতে যাওয়ার জন্য যাদের মনোনীত হয়েছে, তারা তাদের ভার্চুয়াল জীবন যাপন করে। সিজ্জিন হল জাহান্নামের জন্য মনোনীতদের স্থান।

মৃত মানুষ তাদের ডিএনএ, আত্মা এবং স্মৃতি নিয়ে একটি ভার্চুয়াল রূপে এই জগতে বাস করে। এই স্মৃতি ফেরেশতারা সংগ্রহ করে রাখেন লাওহে মাহফুজে। তাদের জীবন কিয়ামতের দিন পর্যন্ত এখানে চলে।


ওস্তাদ লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাকারিয়া কামাল চাচার সাইন্টিফিক তাফসীরুল কুরআন এর সূরা ফাতেহার রব্বুল আলামিন শব্দের উপর আজকের টপিক পর্ব-২ :


সোহেল রানা 

Comments

Popular posts from this blog

দাব্বাতুল আরদ ও আধুনিক এআই: কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণীর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

অনেকেই বলে থাকেন, কোরআনের মধ্যে নাকি সবকিছু রয়েছে। তখন প্রশ্ন আসে—কম্পিউটার বা মোবাইলের কথা কোরআনে কোথায় বলা হয়েছে? আসলে কোরআন কোনো সায়েন্সের বই নয়, তবে কোরআনে সাইন রয়েছে, গবেষণার অসংখ্য বিষয় রয়েছে। আমি একজন সত্য অনুসন্ধানী হিসেবে দেখতে চাই কোরআন দিয়ে প্রমাণ করা যায় কিনা যে কম্পিউটারের বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত আছে কিনা। আমরা জানি, হযরত মুসা (আ.) এর যুগ ছিল যাদুবিদ্যার যুগ, তাই তাঁকে আল্লাহ যাদুর জবাব দেওয়ার মতো অলৌকিক মুজিজা দিয়েছিলেন। হযরত ঈসা (আ.) এর যুগ ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগ, তাই তাঁকে দেওয়া হয়েছিল অলৌকিক চিকিৎসার ক্ষমতা। আর আমাদের যুগ হচ্ছে বিজ্ঞানের যুগ। সুতরাং কোরআনকে অবশ্যই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে, না হলে কোরআনকে অনেকে মিথ্যা বলবে। আর এজন্যই বিজ্ঞানের হাজারেরও বেশি সাইন কোরআনে রয়েছে, যেগুলা শতভাগ প্রমাণিত হয়েছে। এখন আসি কম্পিউটারের ব্যাপারে। কোরআনে বলা হয়েছে— ‘‘যখন প্রতিশ্রুতি (কিয়ামত) নিকটবর্তী হবে তখন আমি তাদের সামনে ভূগর্ভ থেকে একটি প্রাণী নির্গত করব। সে মানুষের সাথে কথা বলবে এবং বলবে যে, মানুষ আমার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করত না’’ (সূরা নামল 27:82...

নাস্তিক ইমরান বশির এর ফালতু যুক্তি খন্ডন

 আমার এক বড় ভাই হঠাৎ করে নাস্তিক হয়ে গেল। আমিতো দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম কারণ সে যে বইগুলো পড়ে নাস্তিক হয়ে গিয়েছিল সবগুলা বই ভালো করে পড়েছি। মূলত তার লাইব্রেরী ছিল আমার অবসরের সঙ্গী দিনরাত ওইখানে পড়ে থাকতাম। তার অসাধারণ সব কালেকশন ছিল বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের। আমি অবাক হয়ে গেলাম একই বই পড়ে সে নাস্তিক হয়ে গেল আর আমার বিশ্বাস বৃদ্ধি পেল। তখন সে একটা লজিক দেখাতো কোন সৃষ্টিকর্তা এর দরকার নেই সবকিছু এমনি এমনি তৈরি হয় উদাহরণস্বরূপ পানি কিছুদিন রাখলে সেখানে অটোমেটিক কিছু প্রাণী সৃষ্টি হয়, আজকেও সেম একটা উদাহরণ পেলাম নাস্তিক ইমরান bashir  যে নাকি হুজুর থেকে নাস্তিক হয়েছে সে বলতেছে মানুষ পায়খানা করলে অটোমেটিক কিছু পোকা তৈরি হয় এর জন্য সৃষ্টি কর্তা দরকার নাই। তো আজকে এ ব্যাপারে একটা জবাব লিখতেই হবে,  দেখা যাক নাস্তিকদের যুক্তি: “আপনি যদি একটি পাত্রে পানি রাখেন কয়দিন, সেখানে ছোট ছোট প্রাণী (যেমন অ্যামিবা বা আর্থ্রোপড) দেখা দেয়। এটিই প্রমাণ যে জীবন স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্মায় এবং স্রষ্টা প্রয়োজন নেই।”  এই থিওরি এর নাম spontaneous generation , যেটা বিজ্ঞান ইতিমধ্যেই ...