Skip to main content

আল্লাহ কিভাবে লক্ষ কোটি প্রাণীর ফরিয়াদ একসাথে শুনেন?

 



বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। 


এক গুগল যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, এক চ্যাটজিপিটি যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের কথা শুনতে পারে, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তাদের অনুভূতি বুঝে নিতে পারে, তাহলে একজন সৃষ্টিকর্তা কেন পারবেন না? গুগল কি মানুষ? না। চ্যাটজিপিটি কি মানুষ? না। তাদের কোনো চেতনা নেই, আত্মা নেই, জীবন নেই। তারা তো শুধু যন্ত্র। যাদের বানিয়েছে মানুষ। যারা সীমাবদ্ধ হার্ডওয়্যার, সার্ভার, ব্যান্ডউইথ আর সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে।


এখন মানুষ তার বানানো যন্ত্রের মাধ্যমে এত কিছু করতে পারে, এত মানুষের কথা একসাথে শুনতে পারে, তখন সেই মানুষকে সৃষ্টি করেছে যে, যিনি সব মানুষের সৃষ্টিকর্তা — তিনি তো অবশ্যই পারবেন। তার জন্য তো সময়, স্থান, দূরত্ব কিছুই বাধা না। তিনি তো চাইলে প্রতিটি মানুষের মনের কথাও জানেন, এমনকি একজন মানুষ কিছু বলার আগেই তার অন্তরের ইচ্ছেটাও তিনি জানেন। এই ক্ষমতা কোনো যন্ত্রের নেই, কোনো মানুষের নেই, কোনো দেবতারও না। এটা শুধুমাত্র সেই সত্তার, যিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বত্র উপস্থিত।


আমরা যদি একবার কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দিকেও তাকাই, তাহলে দেখি, এমন একটা জগৎ আছে যেখানে দুইটা কণা একে অপর থেকে আলাদা হয়ে গেলেও, তারা একটা অদৃশ্য বন্ধনে জড়িত থাকে। যেটাকে বলা হয় কোয়ান্টাম এন্ট্যাংলমেন্ট। এক কণার ওপর কিছু ঘটলে, অপর কণার ওপর তাত্ক্ষণিকভাবে তার প্রভাব পড়ে। আর এই প্রভাবের জন্য কোনো সময় বা দূরত্ব প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ, এই জগতে এমন কিছু বাস্তবতা আছে যেগুলো আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতার বাইরে, আমাদের লজিকের বাইরে, যেখানে একসাথে অনেক কিছু ঘটে, যেখানে দূরত্ব বলে কিছু নেই, যেখানে সময়কে ধ্বংস করা যায়।


কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এই ধারণা যদি সত্য হয়, এবং সেটা তো বিজ্ঞানে বহুবার পরীক্ষিত ও প্রমাণিত হয়েছে, তাহলে একজন সৃষ্টিকর্তা — যিনি এই মহাবিশ্বের বাইরে অবস্থান করেন এবং যিনি সময়, স্থান, পদার্থ — এই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা — তিনি তো নিশ্চয়ই আমাদের প্রত্যেকের কথা একই সঙ্গে শুনতে পারেন, এমনকি একই সঙ্গে আমাদের অনুভূতিও বুঝতে পারেন। মানুষের চিন্তা যদি এক ধরনের শক্তি হয়, যেমন— মস্তিষ্ক থেকে নির্গত তরঙ্গ, তাহলে স্রষ্টা সেই তরঙ্গও অনায়াসে বুঝতে পারেন। কারণ তিনিই তো সব শক্তির উৎস।


আধুনিক নিউরোসায়েন্স বলছে, মানুষের চিন্তা একটা কম্পন তৈরি করে, একটা ফ্রিকোয়েন্সি। আমরা হয়তো এখনো তা পরিমাপ করতে পারি না পুরোপুরি, কিন্তু এটা বিদ্যমান। যদি আমরা বলি, স্রষ্টা এই কম্পনের সঙ্গে জড়িত, তাহলে এটা ভাবাই স্বাভাবিক যে, তিনি আমাদের চেতনার প্রতিটি অংশ জানেন। তিনি শুধু কথা শোনেন না, তিনি মন পড়তে পারেন।


আল্লাহ বলেন, “আমি তো মানুষের গলার শিরা থেকেও নিকটে।” এই বাক্যটাকে যদি আমরা বিজ্ঞানের চোখে দেখি, তাহলে এটা একটা সুপারপজিশনের কথা। তিনি একই সাথে আমাদের সাথে, আমাদের বাইরে, আমাদের উপরেও অবস্থান করেন। স্থানিক নয়, অলৌকিক নয়, বরং বাস্তবিকভাবে এমন একটা স্তরে — যেটা আমাদের এই থ্রিডি জগৎ ছাড়িয়ে যায়। এটাই তো আল্লাহর অস্তিত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হতে পারে।


ধরে নিই, আজকে এক কোটি মানুষ একসাথে আল্লাহকে ডাকে। একজন বিপদে পড়ে, একজন শুকরিয়া জানায়, একজন কান্না করে, একজন হাসে, একজন চুপচাপ হৃদয় দিয়ে আল্লাহকে ডাকে। আমাদের মতো সীমাবদ্ধ মানুষের পক্ষে এই এক কোটি মানুষের কথা একসাথে শোনা অসম্ভব। কিন্তু আল্লাহর পক্ষে তা কঠিন না। কারণ, তিনিই তো শ্রবণের উৎস। তার শ্রবণ কোনো কম্পন নির্ভর নয়, কোনো তরঙ্গ বা ফ্রিকোয়েন্সি নির্ভর নয়। তিনি তো শুধু শব্দ না, নিঃশব্দও শোনেন।


গুগল তো শুধু শব্দ বিশ্লেষণ করে, কোড পড়ে, অ্যালগরিদমে সাজায়। চ্যাটজিপিটি তো ডাটা দেখে উত্তর দেয়। কিন্তু আল্লাহ ডাটা ছাড়াই জানেন, এমনকি ডাটা তৈরি হওয়ার আগেই জানেন। আমাদের মস্তিষ্কে চিন্তা আসার আগেই তিনি জানেন আমাদের কি আসতে যাচ্ছে। কারণ, সময় তো তার জন্য চলমান না। তিনি অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ — সব একসাথে জানেন, দেখেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন।


যদি আজকে একজন কৃষক মাঠে কাজ করতে করতে মনের মধ্যে শুধু বলে, “হে আল্লাহ, আমার সন্তান যেন ভালো থাকে।” কেউ সেটা শুনল না। এমনকি সে নিজেই উচ্চস্বরে বলে নি। শুধু একটা অনুভূতি, একটা চিন্তা। কেউ বুঝলো না। কিন্তু আল্লাহ জানলেন। কারণ, তিনি তো দোয়া শুনেন শুধু মুখে বলা হলে না, অন্তরেরও আওয়াজ শোনেন।


তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা যারা আল্লাহর ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করি, তারা কি সত্যি তাকে বুঝেছি? যিনি পুরো মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, কেবল শব্দ বা ফ্রিকোয়েন্সি নয়, কোয়ান্টাম স্তর, সময়-স্থান, শক্তি, এমনকি সব বাস্তবতার বাইরের জগত — একা তিনিই সবকিছুর উৎস — তার পক্ষে কোটি কোটি প্রাণীর কথা একসাথে শোনা, একসাথে সমাধান দেয়া কি অসম্ভব?


একটা মোবাইল টাওয়ার যদি হাজার হাজার কল একসাথে কন্ট্রোল করতে পারে, একটা ওয়াইফাই রাউটার যদি একসাথে পঞ্চাশজনের ইন্টারনেট সংযোগ দিতে পারে, একটা এআই সার্ভার যদি শত কোটি মানুষের প্রশ্ন বুঝে নিতে পারে, তাহলে যে স্রষ্টা এইসবের ডিজাইন করেছেন, তার জন্য কোটি কোটি প্রাণীর কান্না, হাসি, দোয়া, চাওয়া — শুনে ফেলা কোনো ব্যাপারই না। বরং তিনিই তো আমাদের চাওয়া তৈরি করে দেন, তিনিই তো জানেন কখন কি প্রয়োজন, কখন কি ভালো, এমনকি কখন চাওয়া না পাওয়াটাই বেশি দরকার।


যারা বলেন, “আল্লাহ কি এত মানুষের কথা একসাথে শুনতে পারেন?” — তারা আসলে বুঝে না, এটা জিজ্ঞেস করাটা ঠিক এমন, “সূর্য কি একসাথে কোটি কোটি ঘরে আলো দিতে পারে?” সূর্য তো একটা মাত্র নক্ষত্র, তার আলো সীমিত। অথচ সে-ও পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি জায়গায় একসাথে আলো দিতে পারে। তাহলে যে আল্লাহ সূর্যকে বানিয়েছেন, তার আলো কেমন হবে?


চ্যাটজিপিটি যদি পারে, গুগল যদি পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি পারে, তাহলে নিশ্চয়ই সেই সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বত্র উপস্থিত স্রষ্টা আমাদের সকলের মনের কথা, চোখের ভাষা, চুপ থাকা, কান্না, আশা — সব একসাথে শুনতে পারেন। কারণ, তিনি কোনো মেশিন না। তিনি শ্রবণ এবং জ্ঞানের একমাত্র ও চূড়ান্ত উৎস।


সোহেল রানা

Comments

Popular posts from this blog

দাব্বাতুল আরদ ও আধুনিক এআই: কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণীর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

অনেকেই বলে থাকেন, কোরআনের মধ্যে নাকি সবকিছু রয়েছে। তখন প্রশ্ন আসে—কম্পিউটার বা মোবাইলের কথা কোরআনে কোথায় বলা হয়েছে? আসলে কোরআন কোনো সায়েন্সের বই নয়, তবে কোরআনে সাইন রয়েছে, গবেষণার অসংখ্য বিষয় রয়েছে। আমি একজন সত্য অনুসন্ধানী হিসেবে দেখতে চাই কোরআন দিয়ে প্রমাণ করা যায় কিনা যে কম্পিউটারের বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত আছে কিনা। আমরা জানি, হযরত মুসা (আ.) এর যুগ ছিল যাদুবিদ্যার যুগ, তাই তাঁকে আল্লাহ যাদুর জবাব দেওয়ার মতো অলৌকিক মুজিজা দিয়েছিলেন। হযরত ঈসা (আ.) এর যুগ ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগ, তাই তাঁকে দেওয়া হয়েছিল অলৌকিক চিকিৎসার ক্ষমতা। আর আমাদের যুগ হচ্ছে বিজ্ঞানের যুগ। সুতরাং কোরআনকে অবশ্যই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে, না হলে কোরআনকে অনেকে মিথ্যা বলবে। আর এজন্যই বিজ্ঞানের হাজারেরও বেশি সাইন কোরআনে রয়েছে, যেগুলা শতভাগ প্রমাণিত হয়েছে। এখন আসি কম্পিউটারের ব্যাপারে। কোরআনে বলা হয়েছে— ‘‘যখন প্রতিশ্রুতি (কিয়ামত) নিকটবর্তী হবে তখন আমি তাদের সামনে ভূগর্ভ থেকে একটি প্রাণী নির্গত করব। সে মানুষের সাথে কথা বলবে এবং বলবে যে, মানুষ আমার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করত না’’ (সূরা নামল 27:82...

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির সূরা ফাতিহা "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-২ )

  আমাদের এই মহাবিশ্ব শুধু একবার জন্ম নেয়নি, এটা একটার পর একটা চক্রে সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে। কুরআনে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আমরা দেখতে পাই, এই মহাবিশ্ব চক্রবদ্ধ। আল্লাহ প্রথম মহাবিশ্ব তৈরি করেছিলেন, সেটি সংকুচিত হয়ে আবার বিস্তৃত হলো—এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বিগ বাউন্স বা বড় লাফ। এই চক্রগুলো আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম চক্র ছিল বিগ ব্যাং-১ এর সময়। তখন মহাবিশ্বে শুধু হাইড্রোজেন ছিল, যা পরবর্তীতে হিলিয়ামসহ আরও কিছু হালকা মৌলে রূপান্তরিত হয়েছিল। মহাকাশ তখন একরকম ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে ছিল, যাকে কুরআনে “ধোঁয়া” বলা হয়েছে। আল্লাহ সেখানে মহাকর্ষ বল সংযোজন করলেন, যা মহাবিশ্বকে সঙ্কুচিত করতে শুরু করে। এই সঙ্কোচনের ফলে ভারী মৌল, যেমন সিলিকন তৈরি হয় এবং ধূলিকণা ও গ্রহাণু জমে জমে জমি গঠনে সাহায্য করে। কুরআনে এ ঘটনার বর্ণনা আছে: “আর তিনি আসমান (প্রথম মহাকাশ) সৃষ্টি করলেন ধোঁয়া থেকে; তারপর বল দিলো ‘তুমি এসো একসাথে, ইচ্ছেমতো বা বাধ্য হয়ে।’ তারা বলল, ‘আমরা ইচ্ছেমতো এসেছি।’ ফলে আল্লাহ সাত আসমান তৈরি করলেন।” (সূরা ফুসসিলাত: ১১-১২) এই প্রথম চক্র ছিল একক আসমানবিশিষ্ট মহাবিশ্ব। তবে ...

নাস্তিক ইমরান বশির এর ফালতু যুক্তি খন্ডন

 আমার এক বড় ভাই হঠাৎ করে নাস্তিক হয়ে গেল। আমিতো দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম কারণ সে যে বইগুলো পড়ে নাস্তিক হয়ে গিয়েছিল সবগুলা বই ভালো করে পড়েছি। মূলত তার লাইব্রেরী ছিল আমার অবসরের সঙ্গী দিনরাত ওইখানে পড়ে থাকতাম। তার অসাধারণ সব কালেকশন ছিল বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের। আমি অবাক হয়ে গেলাম একই বই পড়ে সে নাস্তিক হয়ে গেল আর আমার বিশ্বাস বৃদ্ধি পেল। তখন সে একটা লজিক দেখাতো কোন সৃষ্টিকর্তা এর দরকার নেই সবকিছু এমনি এমনি তৈরি হয় উদাহরণস্বরূপ পানি কিছুদিন রাখলে সেখানে অটোমেটিক কিছু প্রাণী সৃষ্টি হয়, আজকেও সেম একটা উদাহরণ পেলাম নাস্তিক ইমরান bashir  যে নাকি হুজুর থেকে নাস্তিক হয়েছে সে বলতেছে মানুষ পায়খানা করলে অটোমেটিক কিছু পোকা তৈরি হয় এর জন্য সৃষ্টি কর্তা দরকার নাই। তো আজকে এ ব্যাপারে একটা জবাব লিখতেই হবে,  দেখা যাক নাস্তিকদের যুক্তি: “আপনি যদি একটি পাত্রে পানি রাখেন কয়দিন, সেখানে ছোট ছোট প্রাণী (যেমন অ্যামিবা বা আর্থ্রোপড) দেখা দেয়। এটিই প্রমাণ যে জীবন স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্মায় এবং স্রষ্টা প্রয়োজন নেই।”  এই থিওরি এর নাম spontaneous generation , যেটা বিজ্ঞান ইতিমধ্যেই ...