কুরআনের এক আয়াতে বদলে যাওয়া এক ব্রিটিশ বিজ্ঞানীর জীবন
বিজ্ঞান ও ধর্মের সংঘাত বহু পুরোনো। অনেকেই মনে করেন, বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ মানুষকে ধর্ম থেকে দূরে ঠেলে দেয়। কিন্তু ইতিহাস মাঝেমধ্যেই এমন কিছু চরিত্রের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে বিজ্ঞানই হয়ে ওঠে সত্য অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। এমনই এক অনন্য ও বাস্তব সত্য ইতিহাসের নায়ক ব্রিটিশ বিজ্ঞানী প্রফেসর ডক্টর আর্থার জেমস এলিসন (ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর নাম হয় আবদুল্লাহ এলিসন)। ১৯৮৫ সালের কায়রোতে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি আজও বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষকে সমানভাবে তাড়িত করে।
অবচেতন মন ও আত্মার সন্ধানে এক বিজ্ঞানী
প্রফেসর এলিসন কেবল একজন সাধারণ প্রকৌশলী ছিলেন না; তিনি ছিলেন লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান। মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল লাইনের মানুষ হলেও তাঁর আগ্রহের একটা বড় জায়গা জুড়ে ছিল মানুষের মনস্তত্ত্ব, অবচেতন মন এবং 'প্যারাসাইকোলজি' (Parapsychology) বা মানুষের অলৌকিক মানসিক ক্ষমতা। মানুষ যখন ঘুমায়, তখন তার চেতনা বা আত্মার অবস্থা ঠিক কেমন হয়—এই রহস্য ভেদ করতেই তিনি তাঁর জীবনের একটা দীর্ঘ সময় পার করেছিলেন। তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ 'সোসাইটি ফর সাইকিক্যাল রিসার্চ'-এর সভাপতি হিসেবেও এই চেতনাগত রহস্যগুলো নিয়ে গভীর গবেষণা চালাচ্ছিলেন।
কায়রোর সেই ঐতিহাসিক সম্মেলন (১৯৮৫)
১৯৮৫ সালে মিশরের কায়রোতে একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যার মূল প্রতিপাদ্য ছিল "কুরআনের চিকিৎসা বিষয়ক অলৌকিকত্ব" (First International Conference on the Medical Inimitability of the Qur'an)। এই সেমিনারের মূল উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কারের সাথে ১৪০০ বছর আগের কুরআনিক বর্ণনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নামকরা অমুসলিম বিজ্ঞানীদের এই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যেখানে প্রফেসর এলিসনও একজন আমন্ত্রিত গবেষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
যে আয়াতে থমকে গেল বিজ্ঞানের অহংকার
সম্মেলনে প্রফেসর এলিসন পবিত্র কুরআনের সূরা আজ-জুমার-এর ৪২ নম্বর আয়াতটি নিয়ে তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। আয়াতে বলা হয়েছে:
"আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়, আর যার মৃত্যু আসেনি তার প্রাণ হরণ করেন ঘুমের সময়। অতঃপর তিনি যার জন্য মৃত্যুর ফয়সালা করেন তার প্রাণ রেখে দেন এবং অন্যগুলো ফিরিয়ে দেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য..."
এই একটি আয়াত প্রফেসর এলিসনের দীর্ঘদিনের গবেষণার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। আধুনিক 'স্লিপ সায়েন্স' বা ঘুমের বিজ্ঞান ও প্যারাসাইকোলজি নিয়ে তারা এত বছর ধরে ল্যাবরেটরিতে যা প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন, তা এই আয়াতে একদম স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা আছে। বিজ্ঞান বলে, ঘুমের সময় মানুষের সচেতন মন বা ইগো সাময়িকভাবে শরীর থেকে এক ধরণের বিচ্ছিন্ন অবস্থায় চলে যায়, যা এক অর্থে আংশিক বা সাময়িক মৃত্যু। আর জেগে ওঠার অর্থ হলো সেই চেতনার পুনরায় শরীরে ফিরে আসা। ১৪০০ বছর আগে মরুভূমির বুকে বসে কোনো মানুষের পক্ষে সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক সূক্ষ্ম অবস্থাটি এভাবে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব—এই ধ্রুব সত্যটি বুঝতে তাঁর আর বাকি রইল না।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে সত্যের সাক্ষ্য
সেমিনারের অন্যান্য অধিবেশনে যখন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মানবদেহের সৃষ্টিতত্ত্ব ও ভ্রূণবিদ্যার (Embryology) নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সাথে কুরআনের আয়াতের হুবহু মিল স্ক্রিনে তুলে ধরলেন, তখন প্রফেসর এলিসন আর নিজের ভেতরের সত্যকে চেপে রাখতে পারলেন না। বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে যাচাই করে তিনি বুঝতে পারলেন, এই গ্রন্থ কোনো মানুষের তৈরি সাহিত্য নয়, এটি সরাসরি মহাবিশ্বের পরম সৃষ্টিকর্তার বাণী।
সম্মেলনের একেবারে সমাপনী অধিবেশনে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে উপস্থিত সবার সামনে সশরীরে "শাহাদাহ" (কালিমা) পাঠ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। লন্ডনের খ্যাতনামা এই বিজ্ঞানী সেদিন থেকে পরিচিত হন "আব্দুল্লাহ এলিসন" নামে।
আমৃত্যু বিশ্বাসের অবিচল পথচলা
ইসলাম গ্রহণের পর প্রফেসর এলিসনকে পশ্চিমা বিজ্ঞানী মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু একজন খাঁটি বিজ্ঞানীর মতোই তিনি তাঁর যুক্তিতে অটল ছিলেন। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে বলতেন, ইসলাম গ্রহণ করার পর মহাবিশ্ব এবং মানুষের চেতনা নিয়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া আরও বেশি স্পষ্ট ও পূর্ণতা পেয়েছে। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম হিসেবে জীবন পার করেন এবং ইসলামিক রীতিনীতি মেনেই ব্রিটেনে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে অনেক সময় ভিউ পাওয়ার জন্য তাঁকে ভুলভাবে "ইহুদি বিজ্ঞানী" বা মুখরোচক নানা কাল্পনিক গল্পে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু সত্যের জন্য কোনো কৃত্রিম রঙের প্রয়োজন হয় না। প্রফেসর আবদুল্লাহ এলিসনের জীবন আমাদের দেখায়—অন্ধবিশ্বাস নয়, বরং নিরপেক্ষ ও মুক্ত মন নিয়ে বিজ্ঞানের চরম শিখরে পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত সেই পরম সত্যের দুয়ারেই মাথা নত করতে হয়, যা আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে মানবতার জন্য নাজিল হয়েছিল।

Comments
Post a Comment