Skip to main content

বিশ্বাস নয়, অস্তিত্বই যথেষ্ট: ইবন সিনার Argument from Contingency

 


মানুষ যখন সত্যের অনুসন্ধানে বের হয়, তখন তার প্রথম প্রশ্নটি সাধারণত এই—“আমি কেন আছি?” এই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে অস্তিত্ব, কারণ, প্রয়োজন ও উদ্দেশ্যের গভীর অনুসন্ধান। ইসলামী দর্শনের ইতিহাসে ইবন সিনা (Avicenna) এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে যে যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন, তা দর্শনের জগতে এক অনন্য মাইলফলক। এই যুক্তিই পরিচিত বুরহান আল-সিদ্দিকিন নামে, যাকে আধুনিক ভাষায় বলা হয় Argument from Contingency বা সম্ভাব্যতা থেকে স্রষ্টার প্রমাণ।


আমি এই বিষয়টি উপস্থাপন করব কোনো আবেগী ধর্মীয় বক্তৃতার ভঙ্গিতে নয়, আবার শুষ্ক একাডেমিক ভাষাতেও নয়। বরং বাস্তবতা, যুক্তি ও অস্তিত্বের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে—যেভাবে একজন সত্যসন্ধানী মানুষ নিজে ভাবতে ভাবতে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।


১. অস্তিত্ব মানেই কি অপরিহার্য?


আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখি—মানুষ, গাছ, গ্রহ, নক্ষত্র, এমনকি এই বিশাল মহাবিশ্ব—সবকিছুর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে: এগুলো একসময় ছিল না এবং একসময় থাকবে না।


একটি মানুষ জন্মের আগে অস্তিত্বহীন ছিল। একটি গাছ বীজ না হলে গাছ হয় না। একটি গ্রহ নির্দিষ্ট সময়ের আগে গঠিত হয়নি। অর্থাৎ, এদের অস্তিত্ব অপরিহার্য নয়।


ইবন সিনা এই ধরনের অস্তিত্বকে বলেছেন—


 মুমকিন আল-উজুদ (Possibly Existent / Contingent Being)


অর্থাৎ এমন সত্তা, যার থাকা বা না-থাকা—দুটোই সম্ভব।


এখানেই মূল প্রশ্ন জন্ম নেয়:


যে জিনিস নিজে নিজে থাকা আবশ্যক নয়, সেটি কেন আছে?


২. সম্ভাব্য জিনিসের অস্তিত্ব কি নিজের দ্বারা সম্ভব?


ধরা যাক, একটি বস্তু আছে যা নিজে নিজে থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তাহলে তার অস্তিত্বের জন্য দুইটি পথ হতে পারে:


১. সে নিজেই নিজেকে অস্তিত্ব দিয়েছে



২. অথবা অন্য কিছু তাকে অস্তিত্ব দিয়েছে


প্রথমটি যুক্তিগতভাবে অসম্ভব। কারণ যে বস্তু আগে ছিল না, সে নিজেকে সৃষ্টি করবে—এটা এক ধরনের আত্মবিরোধী দাবি।


তাই যুক্তি বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় পথেই যায়:


প্রত্যেক সম্ভাব্য সত্তার জন্য একটি কারণ প্রয়োজন


এটি কোনো ধর্মীয় দাবি নয়—এটি সরল বুদ্ধির দাবি।


৩. কারণের শৃঙ্খল কি অসীম হতে পারে?


এখন প্রশ্ন আসে—


ধরা যাক, A নামের একটি সত্তা B-এর কারণে আছে, B আছে C-এর কারণে, C আছে D-এর কারণে… এই শৃঙ্খল কি অসীম পর্যন্ত যেতে পারে?


ইবন সিনা বলেন—না, পারে না।


কারণ যদি প্রতিটি সত্তাই সম্ভাব্য হয় এবং প্রত্যেকটি অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে পুরো শৃঙ্খলটাই নির্ভরশীল থেকে যায়।


একটি উদাহরণ দেই—


ধরা যাক, ১০০ জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে একে অপরের কাঁধে ভর দিয়ে। কেউ মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই। প্রশ্ন হলো—এই ১০০ জন কি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে?


উত্তর স্পষ্ট—না। কারণ পুরো সিস্টেমটাই ভরহীন।


ঠিক তেমনি, যদি অস্তিত্বের শৃঙ্খলে কোথাও কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা না থাকে, তাহলে কিছুই বাস্তবে অস্তিত্বে আসতে পারে না।


৪. অপরিহার্য অস্তিত্ব: ওয়াজিব আল-উজুদ


এখানেই ইবন সিনা একটি মৌলিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান:


 সম্ভাব্য সত্তার অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে হলে একটি অপরিহার্য সত্তা থাকতে হবে

এই সত্তাকে তিনি নাম দিয়েছেন—


ওয়াজিব আল-উজুদ (Necessary Existent)


এই সত্তার বৈশিষ্ট্য কী?


তিনি অস্তিত্বশীল হওয়ায় বাধ্য


তিনি কারো উপর নির্ভরশীল নন


তাঁর অস্তিত্বের জন্য কোনো কারণ লাগে না


তিনি না থাকলে কিছুই থাকতে পারে না


এই সত্তাই হলো—স্রষ্টা।


ইবন সিনার যুক্তিতে লক্ষণীয় বিষয় হলো—তিনি এখানে আকাশ, পৃথিবী, নকশা, জটিলতা বা ডিজাইনের কথা বলেননি। তিনি সরাসরি অস্তিত্ব থেকেই স্রষ্টার দিকে গেছেন।


৫. এই যুক্তির গভীর সৌন্দর্য


বুরহান আল-সিদ্দিকিন-এর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—


 এটি বিশ্বাস দিয়ে শুরু হয় না, বরং অস্তিত্ব দিয়ে শুরু হয়


তিনি বলেননি—“বিশ্ব সৃষ্টি, তাই স্রষ্টা আছে”


তিনি বলেছেন—


 “কিছু আছে—এটাই যথেষ্ট প্রশ্ন তোলার জন্য”


অর্থাৎ, কিছু অস্তিত্বে আছে মানেই একটি অপরিহার্য অস্তিত্ব থাকা আবশ্যক।


এই যুক্তি সেই মানুষদের জন্যও প্রযোজ্য, যারা ধর্ম মানে না, নবুয়ত মানে না, এমনকি ঈশ্বর শব্দটিতেও অস্বস্তি বোধ করে।


কারণ এখানে প্রশ্ন একটাই:


কেন কিছু আছে, শূন্যতার বদলে?


৬. আধুনিক দর্শন ও বিজ্ঞানের আলোকে


আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান বলে—মহাবিশ্বের একটি সূচনা আছে। কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়ামও “কিছুই না” নয়। শক্তি, নিয়ম, সম্ভাবনা—সবই সেখানে বিদ্যমান।


কিন্তু বিজ্ঞান কখনো এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না:


 কেন এই নিয়মগুলো আছে?


ইবন সিনার যুক্তি এখানেই আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ বিজ্ঞান সম্ভাব্য জিনিসের আচরণ ব্যাখ্যা করে, কিন্তু অস্তিত্বের চূড়ান্ত ভিত্তি ব্যাখ্যা করে না।


৭. এই প্রমাণ কেন এত শক্তিশালী?


কারণ এটি—


সময়ের উপর নির্ভরশীল নয়


মহাবিশ্ব চিরন্তন হোক বা সৃষ্ট—দুটোর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য


ধর্মীয় গ্রন্থ উদ্ধৃতি ছাড়াই কাজ করে


যুক্তির মাধ্যমে স্রষ্টার অপরিহার্যতা প্রমাণ করে



এটি কোনো “God of the gaps” যুক্তি নয়। বরং এটি Reason of all reasons।


এখানে এসে আমার নিজের ভেতরে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে যায়। ইবন সিনার এই যুক্তি কোনো দূরের দার্শনিক খেলা নয়, কোনো বইয়ের পাতায় বন্দী তত্ত্বও নয়। এটা খুব নীরবে, খুব সাধারণভাবে আমাদের প্রতিদিনের অস্তিত্বের ভেতর কথা বলে।


আমি আছি—এই সত্যটাই যেন নিজে নিজে বলে দেয়, আমি নিজের দ্বারা নই। আমার থাকা কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় ছিল না। আমি না থাকলেও বাস্তবতা ভেঙে পড়ত না। ঠিক যেমন এই পৃথিবী, এই সূর্য, এই মহাবিশ্ব—সবকিছুই এক অর্থে সম্ভব ছিল, অপরিহার্য ছিল না।


আর এই সম্ভব হওয়ার মাঝখানেই লুকিয়ে থাকে সেই প্রশ্ন, যেটা এড়িয়ে যাওয়া যায় না—কেন তাহলে কিছু আছে? কেন শূন্যতার বদলে অস্তিত্ব?


ইবন সিনা আমাকে কোনো ধর্মীয় স্লোগান ধরিয়ে দেন না। তিনি শুধু যুক্তির হাত ধরে এমন এক জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে পৌঁছানোর পর আর জোর করে বিশ্বাস করতে হয় না। বরং বাস্তবতা নিজেই স্বীকার করে নেয়—একটি এমন সত্তা আছেন, যিনি কারো দ্বারা নন, যাঁর থাকা কোনো দুর্ঘটনা নয়, যাঁর অস্তিত্ব ব্যাখ্যার অপেক্ষায় থাকে না।


এই সত্তাই সেই অপরিহার্য অস্তিত্ব—যাঁকে আমরা স্রষ্টা বলি।


আর আমার কাছে সবচেয়ে গভীর বিষয়টা হলো—এই প্রমাণটা বাইরে কোথাও খুঁজতে হয় না। আকাশের তারা, বিজ্ঞান, ইতিহাস—এসব পরে আসে। প্রথম সাক্ষ্যটা আছে নিজের অস্তিত্বের ভেতরেই।


#ইবন_সিনা #বুরহান_আল_সিদ্দিকিন #ArgumentFromContingency 

#ওয়াজিব_আল_উজুদ #স্রষ্টার_অস্তিত্ব #IslamicPhilosophy 

#অস্তিত্বের_প্রশ্ন #দর্শন #চিন্তার_খোরাক

Comments

Popular posts from this blog

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির সূরা ফাতিহা "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-২ )

  আমাদের এই মহাবিশ্ব শুধু একবার জন্ম নেয়নি, এটা একটার পর একটা চক্রে সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে। কুরআনে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আমরা দেখতে পাই, এই মহাবিশ্ব চক্রবদ্ধ। আল্লাহ প্রথম মহাবিশ্ব তৈরি করেছিলেন, সেটি সংকুচিত হয়ে আবার বিস্তৃত হলো—এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বিগ বাউন্স বা বড় লাফ। এই চক্রগুলো আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম চক্র ছিল বিগ ব্যাং-১ এর সময়। তখন মহাবিশ্বে শুধু হাইড্রোজেন ছিল, যা পরবর্তীতে হিলিয়ামসহ আরও কিছু হালকা মৌলে রূপান্তরিত হয়েছিল। মহাকাশ তখন একরকম ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে ছিল, যাকে কুরআনে “ধোঁয়া” বলা হয়েছে। আল্লাহ সেখানে মহাকর্ষ বল সংযোজন করলেন, যা মহাবিশ্বকে সঙ্কুচিত করতে শুরু করে। এই সঙ্কোচনের ফলে ভারী মৌল, যেমন সিলিকন তৈরি হয় এবং ধূলিকণা ও গ্রহাণু জমে জমে জমি গঠনে সাহায্য করে। কুরআনে এ ঘটনার বর্ণনা আছে: “আর তিনি আসমান (প্রথম মহাকাশ) সৃষ্টি করলেন ধোঁয়া থেকে; তারপর বল দিলো ‘তুমি এসো একসাথে, ইচ্ছেমতো বা বাধ্য হয়ে।’ তারা বলল, ‘আমরা ইচ্ছেমতো এসেছি।’ ফলে আল্লাহ সাত আসমান তৈরি করলেন।” (সূরা ফুসসিলাত: ১১-১২) এই প্রথম চক্র ছিল একক আসমানবিশিষ্ট মহাবিশ্ব। তবে ...

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-১)"

 এই মহাবিশ্ব, যেখানে আমরা এখন বাস করছি, তা অত্যন্ত নিখুঁত নিয়ম ও সূচনাগত বিন্যাস অনুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে। এই সূচনাগত নিখুঁততা ও প্রাকৃতিক নিয়মের কারণে এটি আজকের অবস্থানে এসেছে। পৃথিবীর উপাদান ও যৌগসমূহ এমন সব প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ করে যা পরস্পরের সাথে এত সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে তা আমাদের জীবনকে টিকিয়ে রাখে। পানির পরিমাণও এখানে বিপুল এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলো খুবই অনন্য। এসব কিছু আমাদের বোঝায় যে এই মহাবিশ্ব একটি অসাধারণভাবে বুদ্ধিমান সত্তার সৃষ্টি, যিনি আল কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ীই ঈশ্বর। তিনি শুধু সৃষ্টি করেননি, তিনি বিকাশকারকও। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও দার্শনিক চিন্তাধারায় একটি বিকল্প ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যেটিকে বলা হয় মাল্টিভার্স বা বহু-বিশ্ব তত্ত্ব। এর মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, এমন অসংখ্য বিগ ব্যাং (Big Bang) ঘটতে পারে যার ফলে অসংখ্য মহাবিশ্ব তৈরি হয় এবং এইসবের মধ্যে কাকতালীয়ভাবে একটি মহাবিশ্ব জীবনের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে। এই ধারনা ঈশ্বরের উপস্থিতি ছাড়াই সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। ফিলোসফিক্যাল আলোচনায় "fine-tuning" বা সূক্ষ্ম-সামঞ্জস্য শব্দটি প্রায়ই ব্যব...

আল্লাহ কিভাবে লক্ষ কোটি প্রাণীর ফরিয়াদ একসাথে শুনেন?

  বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।  এক গুগল যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, এক চ্যাটজিপিটি যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের কথা শুনতে পারে, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তাদের অনুভূতি বুঝে নিতে পারে, তাহলে একজন সৃষ্টিকর্তা কেন পারবেন না? গুগল কি মানুষ? না। চ্যাটজিপিটি কি মানুষ? না। তাদের কোনো চেতনা নেই, আত্মা নেই, জীবন নেই। তারা তো শুধু যন্ত্র। যাদের বানিয়েছে মানুষ। যারা সীমাবদ্ধ হার্ডওয়্যার, সার্ভার, ব্যান্ডউইথ আর সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে। এখন মানুষ তার বানানো যন্ত্রের মাধ্যমে এত কিছু করতে পারে, এত মানুষের কথা একসাথে শুনতে পারে, তখন সেই মানুষকে সৃষ্টি করেছে যে, যিনি সব মানুষের সৃষ্টিকর্তা — তিনি তো অবশ্যই পারবেন। তার জন্য তো সময়, স্থান, দূরত্ব কিছুই বাধা না। তিনি তো চাইলে প্রতিটি মানুষের মনের কথাও জানেন, এমনকি একজন মানুষ কিছু বলার আগেই তার অন্তরের ইচ্ছেটাও তিনি জানেন। এই ক্ষমতা কোনো যন্ত্রের নেই, কোনো মানুষের নেই, কোনো দেবতারও না। এটা শুধুমাত্র সেই সত্তার, যিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বত্র উপস্থিত। আমরা যদি একবার কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দিকেও তাকাই, তা...