Skip to main content

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত বাধ্যতামূলক করা যাবে না যেই কারণে

 প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত বাধ্যতামূলক করা মানে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া। যেহেতু সংগীত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে, সেহেতু এটা একটা আলাদা বিষয় হিসেবে থাকবে, মানে পরীক্ষায় নাম্বার থাকবে, ফেল পাসের হিসাব থাকবে। এখানেই আমার আপত্তি। ইসলামী শরীয়তে গান-বাজনা স্পষ্টভাবে হারাম। নবী করিম (সা.) গান-বাজনা, মদ, জুয়া, ব্যভিচার—এইসব হারাম জিনিস ধ্বংস করার জন্যই প্রেরিত হয়েছিলেন। এখন সেই হারাম জিনিসকেই আবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার অংশ বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা কি ন্যায়সঙ্গত?


বাংলাদেশ একটা মুসলিম প্রধান দেশ, প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষ মুসলমান। তাদের বিশ্বাস, তাদের জীবনধারা—সব ইসলামভিত্তিক। তাহলে ইসলামে যেটাকে হারাম বলা হয়েছে, সেটা বাধ্যতামূলক করে শেখানো হবে, এটা কি সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি অবমাননা নয়? ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কি ধর্মবিরোধিতা?


সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট লেখা আছে, “প্রত্যেক নাগরিক তার ধর্ম পালন, প্রচার ও প্রসারের অধিকার রাখে।” তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়ে রাষ্ট্র যদি সংগীতকে বাধ্যতামূলক করে দেয়, সেটা কি সংবিধান লঙ্ঘন নয়? আপনারা কি চাইলেই মুসলমানদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যা খুশি চাপিয়ে দিতে পারেন?


ধরেন, যদি হিন্দু বা বৌদ্ধদের ধর্মবিরোধী কিছু পড়ানো হতো, তাহলে কি এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত? পারতেন? পারতেন না। কিন্তু মুসলমানদের ক্ষেত্রে কেন এই অবস্থা? যত অন্যায়, যত পরীক্ষা-নিরীক্ষা—সব মুসলমানদের উপরই চালানো হয়। আজ সেই ধর্মের বিরুদ্ধে শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি হচ্ছে—এটা লজ্জাজনক।


সংগীত শেখানো যদি কেউ নিজের ইচ্ছায় শেখে, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু সেটা বাধ্যতামূলক করা মানে মানুষকে তার ধর্মবিরুদ্ধ কিছুতে জোর করে ঠেলে দেওয়া। একজন মুসলমান বাবা-মা তার সন্তানকে হারাম জিনিস থেকে বাঁচাতে চায়, কিন্তু স্কুলে গিয়ে সে যদি শুনে—“সংগীতের ক্লাস না করলে ফেল করবে”—তাহলে সেটা জুলুম ছাড়া আর কী? এটা তো জোর করে হারাম শেখানো।


ইসলামী শরীয়তে গান-বাজনা শুধু হারাম না, এটা আত্মাকে ধ্বংস করে, পাপের দিকে টেনে নিয়ে যায়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, “আমার উম্মতের মধ্যে কিছু লোক থাকবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।” (সহিহ বুখারী) এখন এই হাদিসের পরও যারা সংগীতকে বাধ্যতামূলক করে শিশুদের শেখাতে চায়, তারা কি বুঝতে পারে তারা কী করছে?


শিশুদের কোমল মন। তারা যা দেখে, তাই শেখে। ছোটবেলা থেকেই যদি হারাম জিনিসকে “শিক্ষা”র নামে মিষ্টি করে শেখানো হয়, তাহলে তারা বড় হয়ে কীভাবে বুঝবে এটা পাপ? এটা ধর্মের ভিত থেকে ধীরে ধীরে বিশ্বাসকে নষ্ট করার একটা পরিকল্পনা বলেই মনে হয়।


বাংলাদেশের সংস্কৃতি মানে ইসলামবিরোধিতা না। আমাদের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি—সব ইসলামী মূল্যবোধে গড়া। কেউ যদি মনে করে গান-বাজনা ছাড়া সংস্কৃতি বিকাশ সম্ভব না, তাহলে সেটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আমরা কবিতা, সাহিত্য, চারুকলা—অসংখ্য উপায়ে মানবিকতা শেখাতে পারি। কিন্তু হারামকে শিক্ষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া মানে জাতিকে বিভ্রান্ত করা।


একটা বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা দরকার—যে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান, সেখানে ইসলামবিরোধী কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্র যদি সত্যিই “সব ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা” দেখাতে চায়, তাহলে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে পদদলিত করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।


আমি স্পষ্টভাবে বলছি, সংগীত বাধ্যতামূলক করা মানে হারামকে বৈধ করা। এটা ইসলামবিরোধী, এটা অন্যায়, এটা সংবিধানবিরোধী। শিশুরা যদি ছোট থেকেই এমন শিক্ষার মধ্যে বেড়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা ধর্মকে কীভাবে বুঝবে? তারা হারাম-হালালের সীমা চিনবে কীভাবে?


এভাবে ধীরে ধীরে একটা জাতির আত্মা থেকে ইসলামকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মুসলমানদের উপর এই চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে “সংস্কৃতি”র নামে, “শিক্ষা”র নামে। কিন্তু শিক্ষা কখনও ধর্মবিরোধী হতে পারে না। শিক্ষা মানুষকে সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মভীরু করে, হারাম শেখায় না।


সংগীতকে ঐচ্ছিক রাখা যেতে পারে, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়। যেহেতু ইসলাম এটাকে হারাম বলেছে, তাই এটাকে স্কুলের বাধ্যতামূলক পাঠ্য হিসেবে যুক্ত করা সম্পূর্ণ ভুল। এটা শুধু ধর্মবিরোধী না, এটা একটা জাতির বিশ্বাস, আত্মপরিচয় ও আদর্শের বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত।


সোহেল রানা

Comments

Popular posts from this blog

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির সূরা ফাতিহা "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-২ )

  আমাদের এই মহাবিশ্ব শুধু একবার জন্ম নেয়নি, এটা একটার পর একটা চক্রে সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে। কুরআনে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আমরা দেখতে পাই, এই মহাবিশ্ব চক্রবদ্ধ। আল্লাহ প্রথম মহাবিশ্ব তৈরি করেছিলেন, সেটি সংকুচিত হয়ে আবার বিস্তৃত হলো—এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বিগ বাউন্স বা বড় লাফ। এই চক্রগুলো আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম চক্র ছিল বিগ ব্যাং-১ এর সময়। তখন মহাবিশ্বে শুধু হাইড্রোজেন ছিল, যা পরবর্তীতে হিলিয়ামসহ আরও কিছু হালকা মৌলে রূপান্তরিত হয়েছিল। মহাকাশ তখন একরকম ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে ছিল, যাকে কুরআনে “ধোঁয়া” বলা হয়েছে। আল্লাহ সেখানে মহাকর্ষ বল সংযোজন করলেন, যা মহাবিশ্বকে সঙ্কুচিত করতে শুরু করে। এই সঙ্কোচনের ফলে ভারী মৌল, যেমন সিলিকন তৈরি হয় এবং ধূলিকণা ও গ্রহাণু জমে জমে জমি গঠনে সাহায্য করে। কুরআনে এ ঘটনার বর্ণনা আছে: “আর তিনি আসমান (প্রথম মহাকাশ) সৃষ্টি করলেন ধোঁয়া থেকে; তারপর বল দিলো ‘তুমি এসো একসাথে, ইচ্ছেমতো বা বাধ্য হয়ে।’ তারা বলল, ‘আমরা ইচ্ছেমতো এসেছি।’ ফলে আল্লাহ সাত আসমান তৈরি করলেন।” (সূরা ফুসসিলাত: ১১-১২) এই প্রথম চক্র ছিল একক আসমানবিশিষ্ট মহাবিশ্ব। তবে ...

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-১)"

 এই মহাবিশ্ব, যেখানে আমরা এখন বাস করছি, তা অত্যন্ত নিখুঁত নিয়ম ও সূচনাগত বিন্যাস অনুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে। এই সূচনাগত নিখুঁততা ও প্রাকৃতিক নিয়মের কারণে এটি আজকের অবস্থানে এসেছে। পৃথিবীর উপাদান ও যৌগসমূহ এমন সব প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ করে যা পরস্পরের সাথে এত সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে তা আমাদের জীবনকে টিকিয়ে রাখে। পানির পরিমাণও এখানে বিপুল এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলো খুবই অনন্য। এসব কিছু আমাদের বোঝায় যে এই মহাবিশ্ব একটি অসাধারণভাবে বুদ্ধিমান সত্তার সৃষ্টি, যিনি আল কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ীই ঈশ্বর। তিনি শুধু সৃষ্টি করেননি, তিনি বিকাশকারকও। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও দার্শনিক চিন্তাধারায় একটি বিকল্প ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যেটিকে বলা হয় মাল্টিভার্স বা বহু-বিশ্ব তত্ত্ব। এর মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, এমন অসংখ্য বিগ ব্যাং (Big Bang) ঘটতে পারে যার ফলে অসংখ্য মহাবিশ্ব তৈরি হয় এবং এইসবের মধ্যে কাকতালীয়ভাবে একটি মহাবিশ্ব জীবনের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে। এই ধারনা ঈশ্বরের উপস্থিতি ছাড়াই সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। ফিলোসফিক্যাল আলোচনায় "fine-tuning" বা সূক্ষ্ম-সামঞ্জস্য শব্দটি প্রায়ই ব্যব...

আল্লাহ কিভাবে লক্ষ কোটি প্রাণীর ফরিয়াদ একসাথে শুনেন?

  বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।  এক গুগল যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, এক চ্যাটজিপিটি যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের কথা শুনতে পারে, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তাদের অনুভূতি বুঝে নিতে পারে, তাহলে একজন সৃষ্টিকর্তা কেন পারবেন না? গুগল কি মানুষ? না। চ্যাটজিপিটি কি মানুষ? না। তাদের কোনো চেতনা নেই, আত্মা নেই, জীবন নেই। তারা তো শুধু যন্ত্র। যাদের বানিয়েছে মানুষ। যারা সীমাবদ্ধ হার্ডওয়্যার, সার্ভার, ব্যান্ডউইথ আর সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে। এখন মানুষ তার বানানো যন্ত্রের মাধ্যমে এত কিছু করতে পারে, এত মানুষের কথা একসাথে শুনতে পারে, তখন সেই মানুষকে সৃষ্টি করেছে যে, যিনি সব মানুষের সৃষ্টিকর্তা — তিনি তো অবশ্যই পারবেন। তার জন্য তো সময়, স্থান, দূরত্ব কিছুই বাধা না। তিনি তো চাইলে প্রতিটি মানুষের মনের কথাও জানেন, এমনকি একজন মানুষ কিছু বলার আগেই তার অন্তরের ইচ্ছেটাও তিনি জানেন। এই ক্ষমতা কোনো যন্ত্রের নেই, কোনো মানুষের নেই, কোনো দেবতারও না। এটা শুধুমাত্র সেই সত্তার, যিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বত্র উপস্থিত। আমরা যদি একবার কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দিকেও তাকাই, তা...