Skip to main content

শিয়াদের ইমাম মেহেদী !!!

 


আমি জন্মসূত্রে সুন্নি, কিন্তু আমি নিজেকে শুধু মুসলিম বলেই পরিচয় দিই। অনেক দিন ধরে একটা জিনিস আমার মনে প্রশ্ন তোলে — শিয়ারা যে বলে, নবীর বংশ থেকে বারো জন ইমাম এসেছেন, যাদের মধ্যে শেষজন ইমাম মাহদি — এখন গায়েব, তিনি ছোটবেলাতেই গায়েব হয়েছেন, ৯০০ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে — বিষয়টা তো হাস্যকর মনে হয়, তাই না? কিন্তু এটা কি পুরোপুরি বাতিল, নাকি এতে কিছু সত্য আছে?

আমি এ নিয়ে বহুদিন ধরে পড়াশোনা করছি, শুধু ইসলামী হাদিস বা ইতিহাস নয়, বাইবেলও পড়েছি। আমার স্মৃতিশক্তি খুব ধারালো নয়, কিন্তু যেটুকু মনে আছে, সেটাও অনেক সময় গভীর মিল তৈরি করে।
শিয়ারা বলে, নবীর পরিবারের বারো জন ইমাম ছিলেন। তাদের প্রায় সব ইমামকেই হত্যা করা হয়েছে। এই কারণেই তারা বিশ্বাস করে, সর্বশেষ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান (যাকে ইমাম মাহদি বলা হয়), ছোটবেলায় গায়েব হন — আল্লাহ তাঁকে তুলে নিয়েছেন, আর একদিন তিনি ফিরে আসবেন, যেদিন পৃথিবী অন্যায়ে ভরে যাবে।
সহিহ হাদিস বইয়েও “বারোজন খলিফা”র কথা এসেছে। যেমন:
> “আমার পরে বারোজন খলিফা থাকবে, এবং তারা সবাই কুরাইশ বংশীয়।”
— সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২১
এই হাদিস আবু দাউদ, তিরমিজি ও মুসনাদে আহমদেও এসেছে। কিন্তু সুন্নিদের কেউই নির্দিষ্টভাবে এই বারোজন কারা তা বলতে পারেন না। কেউ বলেন চার খলিফা, কেউ বলেন উমাইয়া বা আব্বাসি খলিফা — কিন্তু তালিকা মেলে না।
অন্যদিকে শিয়ারা বলে — এই বারোজন ইমাম হলেন:
আলী, হাসান, হুসাইন, জয়নুল আবেদিন, মুহাম্মদ বাকির, জাফর সাদিক, মূসা কাযিম, আলী রেজা, মুহাম্মদ তাকী, আলী নাকি, হাসান আসকারি এবং মাহদি (মুহাম্মদ ইবনে হাসান)।
এটা আমার কাছে অনেকটাই যুক্তিযুক্ত মনে হয়, ১২ জন খলিফার বিষয়ে। কারণ ইমাম মাহদির আগমনের হাদিসেও এসেছে যে, তিনি হযরত ফাতিমা (রা.)-এর বংশধর হবেন।
“মাহদি হবে ফাতিমা (রা.)-এর বংশধর।”
— সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪২৮৬
“মাহদি আমাদের আহলে বাইতের একজন। আল্লাহ এক রাতেই তাঁকে (নেতৃত্বের জন্য) প্রস্তুত করবেন।”
— সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০৮৫
আর বারো ইমামের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হচ্ছে এই হাদিস:
“আমি তোমাদের মাঝে দুইটি ভারী (মূল্যবান) জিনিস রেখে যাচ্ছি। যদি তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করো, তাহলে আমার পরে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না:
এক— আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন),
দুই— আমার আহলে বাইত (পরিবারবর্গ)।”
সুনান তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৮৮
মুস্তাদরাক আল-হাকিম, ৩/১৪৮
মুসনাদ আহমদ, ৩/১৭, ৫/১৮২
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪০৮
যেহেতু আহলে বাইতকে আঁকড়ে ধরতে বলেছেন, সে ক্ষেত্রে ইমাম অবশ্যই আহলে বাইত থেকেই হতে হবে।
সত্যি বলতে, আমি অনেক দিন “গায়েব” হওয়ার ব্যাপারটাকে পাত্তা দিইনি। কিন্তু একদিন বাইবেল পড়তে গিয়ে একটা আজব মিল খেয়াল করলাম। হযরত ঈসা (আ.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে Revelation (প্রকাশিত বাক্য) ১২:১–৫-এ একটা অংশ আছে, যেটা পুরো পড়েই আমি থমকে গেলাম। ইংরেজি বাইবেল থেকে টেক্সটটা ছিল এরকম:
> “A great sign appeared in heaven: a woman clothed with the sun, with the moon under her feet and a crown of twelve stars on her head. She was pregnant and cried out in pain as she was about to give birth.
Then another sign appeared in heaven: an enormous red dragon... The dragon stood in front of the woman who was about to give birth, so that it might devour her child the moment he was born.
She gave birth to a son, a male child, who ‘will rule all the nations with an iron scepter.’ And her child was snatched up to God and to his throne.”
— Revelation 12:1–5
বাংলা অর্থ:
> “আকাশে এক বিশাল নিদর্শন দেখা গেল: সূর্যে আবৃত এক নারী, তাঁর পায়ের নিচে চাঁদ, আর তাঁর মাথায় বারোটি তারার মুকুট। তিনি গর্ভবতী ছিলেন এবং প্রসবের যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলেন।
তারপর আকাশে আরেকটি নিদর্শন দেখা গেল: এক বিশাল লাল ড্রাগন... ড্রাগনটি সেই নারীর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন যখনই সে সন্তান প্রসব করে, তখনই ড্রাগনটি শিশুটিকে গিলে ফেলে।
সে একটি পুত্রসন্তান জন্ম দিল—একটি ছেলে, যে লোহার রাজদণ্ড দিয়ে সব জাতিকে শাসন করবে। আর সেই শিশুটিকে ঈশ্বরের কাছে ও তাঁর সিংহাসনের নিকট তুলে নেওয়া হলো।”
এই অংশটুকু পড়েই আমার মাথায় বাজ পড়লো।
প্রথমে দেখি — নারী সূর্যে মোড়া, পায়ের নিচে চাঁদ, মাথায় বারো তারা। তারপর সে একটি পুত্রসন্তান জন্ম দেয়, যে জাতিগুলোকে শাসন করবে লোহার রাজদণ্ড দিয়ে, এবং যাকে ঈশ্বর তুলে নেন তাঁর সিংহাসনে।
এই নারী কি হযরত ফাতেমা (রা.) হতে পারেন না? যাঁর পায়ের নিচে চাঁদ — মুসলিমদের প্রতীক। মাথায় বারো তারা — নবী পরিবারের বারো ইমাম। সন্তান — যিনি গায়েব হন এবং ভবিষ্যতে ফিরে আসবেন ইনসাফ কায়েম করতে।
অনেকে বলে, এটা মেরি বা যিশুকে বোঝায়। কিন্তু আমার কাছে সেটা খুব জোড়াতালি মনে হয়। কারণ খ্রিস্টানদের প্রতীক কখনোই চাঁদ ও তারা নয় — ওদের প্রতীক হলো ক্রস। বাইবেলে মেরিকে কোথাও ১২ তারা বা চাঁদসহ প্রতীক করা হয়নি। হযরত ফাতেমার মাথায় যদি ১২ ইমামের প্রতীক হিসেবে তারা থাকে, সেটা বরং অনেক বেশি সংগতিপূর্ণ।
তারপর দেখি —
> “Her child was caught up to God and to his throne.”
এইটা তো একদম গায়েব হওয়ার বিষয়টাই বুঝায় — যাকে তুলে নেওয়া হয়েছে আসমানে।
ইসলামেও এর দৃষ্টান্ত আছে। হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে:
> “বরং আল্লাহ তাঁকে তাঁর কাছে তুলে নিয়েছেন।”
— সূরা নিসা, ৪:১৫৮
তাহলে কেউ যদি বলে, ইমাম মাহদি গায়েব — তা খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু না। বরং এটা আল্লাহর আগের কাজেরই ধারাবাহিকতা।
মাহদি কিয়ামতের আগে আসবেন — এটা শুধু শিয়ারা না, সুন্নিরাও মানে।
> “যদি পৃথিবীর বাকি কেবল একদিনও থাকে, আল্লাহ এমন একজন পাঠাবেন, যিনি দুনিয়াকে ইনসাফে ভরে দেবেন যেমনটা তা অন্যায়ে ভরা ছিল।”
— সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪২৮২
এই লোকই তো মাহদি — যিনি পৃথিবীতে ইনসাফ ফিরিয়ে আনবেন। কুরআন, হাদিস, এমনকি বাইবেলের প্রতীকেও এই মিল পাওয়া যায়। আমি এটা হালকাভাবে নিতে পারি না।
> “আল্লাহ তাদের জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে খিলাফত দান করবেন... এবং তাদের দ্বীনকে সুদৃঢ় করবেন।”
— সূরা নূর, ২৪:৫৫
এইভাবে দেখলে, বাইবেল, কুরআন, হাদিস — সব মিলিয়ে এক ধরনের ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। আমি কাউকে মানতে বলছি না। আমি শুধু একজন সাধারণ মুসলিম হিসেবে পড়েছি, চিন্তা করেছি। আমি শিয়া না, সুন্নি পরিচয়েও গর্ব নেই — আমি শুধু মুসলিম হতে চাই।
গায়েব ইমাম, বারো ইমাম, বাইবেলের প্রতীক — সব মিলেই একটা প্রেক্ষাপট তৈরি করে, যেটাকে অস্বীকার করা কঠিন।
আমি ফিরকাবাজি করতে চাই না। সত্য যেদিকে থাকুক, তা গ্রহণ করাই আমার কর্তব্য।
এই লেখা আমার মনের কথা।
যদি কোনো ভুল করি, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। আর যদি কেউ উপকার পায়, সব কৃতিত্ব আল্লাহর।
সোহেল রানা

Comments

Popular posts from this blog

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির সূরা ফাতিহা "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-২ )

  আমাদের এই মহাবিশ্ব শুধু একবার জন্ম নেয়নি, এটা একটার পর একটা চক্রে সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে। কুরআনে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আমরা দেখতে পাই, এই মহাবিশ্ব চক্রবদ্ধ। আল্লাহ প্রথম মহাবিশ্ব তৈরি করেছিলেন, সেটি সংকুচিত হয়ে আবার বিস্তৃত হলো—এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বিগ বাউন্স বা বড় লাফ। এই চক্রগুলো আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম চক্র ছিল বিগ ব্যাং-১ এর সময়। তখন মহাবিশ্বে শুধু হাইড্রোজেন ছিল, যা পরবর্তীতে হিলিয়ামসহ আরও কিছু হালকা মৌলে রূপান্তরিত হয়েছিল। মহাকাশ তখন একরকম ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে ছিল, যাকে কুরআনে “ধোঁয়া” বলা হয়েছে। আল্লাহ সেখানে মহাকর্ষ বল সংযোজন করলেন, যা মহাবিশ্বকে সঙ্কুচিত করতে শুরু করে। এই সঙ্কোচনের ফলে ভারী মৌল, যেমন সিলিকন তৈরি হয় এবং ধূলিকণা ও গ্রহাণু জমে জমে জমি গঠনে সাহায্য করে। কুরআনে এ ঘটনার বর্ণনা আছে: “আর তিনি আসমান (প্রথম মহাকাশ) সৃষ্টি করলেন ধোঁয়া থেকে; তারপর বল দিলো ‘তুমি এসো একসাথে, ইচ্ছেমতো বা বাধ্য হয়ে।’ তারা বলল, ‘আমরা ইচ্ছেমতো এসেছি।’ ফলে আল্লাহ সাত আসমান তৈরি করলেন।” (সূরা ফুসসিলাত: ১১-১২) এই প্রথম চক্র ছিল একক আসমানবিশিষ্ট মহাবিশ্ব। তবে ...

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-১)"

 এই মহাবিশ্ব, যেখানে আমরা এখন বাস করছি, তা অত্যন্ত নিখুঁত নিয়ম ও সূচনাগত বিন্যাস অনুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে। এই সূচনাগত নিখুঁততা ও প্রাকৃতিক নিয়মের কারণে এটি আজকের অবস্থানে এসেছে। পৃথিবীর উপাদান ও যৌগসমূহ এমন সব প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ করে যা পরস্পরের সাথে এত সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে তা আমাদের জীবনকে টিকিয়ে রাখে। পানির পরিমাণও এখানে বিপুল এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলো খুবই অনন্য। এসব কিছু আমাদের বোঝায় যে এই মহাবিশ্ব একটি অসাধারণভাবে বুদ্ধিমান সত্তার সৃষ্টি, যিনি আল কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ীই ঈশ্বর। তিনি শুধু সৃষ্টি করেননি, তিনি বিকাশকারকও। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও দার্শনিক চিন্তাধারায় একটি বিকল্প ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যেটিকে বলা হয় মাল্টিভার্স বা বহু-বিশ্ব তত্ত্ব। এর মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, এমন অসংখ্য বিগ ব্যাং (Big Bang) ঘটতে পারে যার ফলে অসংখ্য মহাবিশ্ব তৈরি হয় এবং এইসবের মধ্যে কাকতালীয়ভাবে একটি মহাবিশ্ব জীবনের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে। এই ধারনা ঈশ্বরের উপস্থিতি ছাড়াই সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। ফিলোসফিক্যাল আলোচনায় "fine-tuning" বা সূক্ষ্ম-সামঞ্জস্য শব্দটি প্রায়ই ব্যব...

আল্লাহ কিভাবে লক্ষ কোটি প্রাণীর ফরিয়াদ একসাথে শুনেন?

  বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।  এক গুগল যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, এক চ্যাটজিপিটি যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের কথা শুনতে পারে, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তাদের অনুভূতি বুঝে নিতে পারে, তাহলে একজন সৃষ্টিকর্তা কেন পারবেন না? গুগল কি মানুষ? না। চ্যাটজিপিটি কি মানুষ? না। তাদের কোনো চেতনা নেই, আত্মা নেই, জীবন নেই। তারা তো শুধু যন্ত্র। যাদের বানিয়েছে মানুষ। যারা সীমাবদ্ধ হার্ডওয়্যার, সার্ভার, ব্যান্ডউইথ আর সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে। এখন মানুষ তার বানানো যন্ত্রের মাধ্যমে এত কিছু করতে পারে, এত মানুষের কথা একসাথে শুনতে পারে, তখন সেই মানুষকে সৃষ্টি করেছে যে, যিনি সব মানুষের সৃষ্টিকর্তা — তিনি তো অবশ্যই পারবেন। তার জন্য তো সময়, স্থান, দূরত্ব কিছুই বাধা না। তিনি তো চাইলে প্রতিটি মানুষের মনের কথাও জানেন, এমনকি একজন মানুষ কিছু বলার আগেই তার অন্তরের ইচ্ছেটাও তিনি জানেন। এই ক্ষমতা কোনো যন্ত্রের নেই, কোনো মানুষের নেই, কোনো দেবতারও না। এটা শুধুমাত্র সেই সত্তার, যিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বত্র উপস্থিত। আমরা যদি একবার কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দিকেও তাকাই, তা...