আল্লাহ সব দেখেন, শোনেন, এবং কাছে আছেন—তাহলে নির্দোষ শিশুরা যখন নির্যাতিত হয়, তখন তাদের সাহায্য করেন না কেন?
এই প্রশ্নটি অনেকের মনে আসে: যদি আল্লাহ সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ এবং সর্বদয় হন, তাহলে কেন নির্দোষ শিশুদের কষ্ট ও নির্যাতন হতে দেন? কেন তিনি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে তাদের রক্ষা করেন না? এটি শুধু বিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং একটি গভীর দার্শনিক ও নৈতিক প্রশ্ন, যা স্রষ্টা ও মানব দুর্ভোগের সম্পর্ককে বুঝতে সাহায্য করে।
এই প্রবন্ধে আমরা কুরআন ও হাদিসের আলোকে এবং যুক্তির মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর বিশ্লেষণ করব।
আল্লাহর গুণাবলি ও তাঁর পরিকল্পনা
আল্লাহ সবকিছু দেখেন ও শোনেন
আল্লাহ কুরআনে বলেছেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।" (সূরা আল-মায়েদা ৫:৭৬)
এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের জীবনে যা কিছু ঘটে, তা আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়। তিনি সবকিছু দেখেন, শোনেন এবং জানেন। তাহলে প্রশ্ন থাকে, কেন তিনি অন্যায় হওয়া সত্ত্বেও সঙ্গে সঙ্গে হস্তক্ষেপ করেন না?
পৃথিবী পরীক্ষার স্থান
আল্লাহ কুরআনে বলেন:
"তিনিই জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন—কে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কাজ করে।" (সূরা আল-মুলক ৬৭:২)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, পৃথিবী কেবলমাত্র সুখের জায়গা নয়, বরং এটি একটি পরীক্ষা। কষ্ট, দুঃখ, বিপদ—এসব পরীক্ষার অংশ। আল্লাহ নির্যাতিত শিশুদের সাহায্য না করার অর্থ এই নয় যে, তিনি তাদের কষ্ট দেখছেন না, বরং এটি দুনিয়াতে মানবজাতির জন্য একটি পরীক্ষা।
মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও দায়বদ্ধতা
মানুষকে সঠিক ও ভুল বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে
আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। মানুষ ভালো এবং মন্দের মধ্যে যে কোনোটি বেছে নিতে পারে। আল্লাহ কুরআনে বলেন:
"নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সরল পথ দেখিয়েছি—এখন সে হয় কৃতজ্ঞ হবে, নয়তো অকৃতজ্ঞ হবে।" (সূরা আদ-দাহর ৭৬:৩)
যারা শিশুদের নির্যাতন করে, তারা নিজেদের খারাপ কাজের জন্য দায়ী। আল্লাহ তাদেরকে বাধ্য করেননি অন্যায় করতে। তাদের ওপর শাস্তি দেওয়া হবে, কিন্তু দুনিয়ায় সব অন্যায় তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয় না, কারণ এই জীবন পরীক্ষার স্থান।
মানুষের দায়িত্ব
কুরআনে বলা হয়েছে:
"আর তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং সেই দুর্বল, নির্যাতিত নারী, শিশু ও পুরুষদের (মুক্তির জন্য) যুদ্ধ করো না, যারা বলে: 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই অত্যাচারী জনপদ থেকে উদ্ধার করো এবং আমাদের জন্য তোমার পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী প্রেরণ করো, এবং আমাদের জন্য তোমার পক্ষ থেকে একজন রক্ষাকর্তা প্রেরণ করো।'" (সূরা আন-নিসা ৪:৭৫)
এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, অত্যাচারিতদের রক্ষা করা মানুষের দায়িত্ব। আল্লাহ মানুষকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন, এবং যদি মানুষ এই দায়িত্ব পালন না করে, তবে তারা নিজেদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী হবে।
শিশুদের কষ্ট ও আখিরাতের ন্যায়বিচার
আখিরাতে পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে
দুনিয়ার সকল অন্যায়ের বিচার দুনিয়াতেই হবে—এমন নয়। অনেক অন্যায়ের চূড়ান্ত বিচার আখিরাতে হবে। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা কি মনে করো যে, আমি ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদেরকে মন্দ লোকদের মতো গণ্য করব? তারা যা করে, তা সমান হতে পারে না।" (সূরা আল-জাসিয়া ৪৫:২১)
অত্যাচারিত শিশুদের দুনিয়ার কষ্টের জন্য আল্লাহ আখিরাতে তাদের চূড়ান্ত পুরস্কার দেবেন। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কষ্ট ভোগ করে, আখিরাতে সে এত বেশি পুরস্কার পাবে যে, সে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট সম্পূর্ণ ভুলে যাবে।" (সহিহ মুসলিম)
অত্যাচারীদের কঠোর শাস্তি
যারা শিশুদের নির্যাতন করে, তাদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কষ্ট দেয় এবং তারা তাওবা করে না, তাদের জন্য জাহান্নামের শাস্তি রয়েছে এবং তাদের জন্য ভয়ংকর শাস্তি রয়েছে।" (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৮)
আল্লাহ কেন সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন না?
অনেকে প্রশ্ন করে, "আল্লাহ যদি সর্বশক্তিমান হন, তাহলে তিনি কেন এইসব অন্যায় প্রতিরোধ করেন না?"
পরীক্ষা ও ধৈর্যের গুরুত্ব
আল্লাহ দুনিয়াকে পরীক্ষা ও ধৈর্যের স্থান হিসেবে তৈরি করেছেন। যদি তিনি প্রত্যেক অন্যায়কারীকে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দিতেন, তাহলে পরীক্ষা বলে কিছু থাকত না।
"নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা, জান-মালের ক্ষতি ও ফল-ফসলের অভাবে পরীক্ষা করব; আর ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দাও।" (সূরা আল-বাকারা ২:১৫৫)
পৃথিবীকে পরিবর্তনের জন্য মানুষকে পাঠানো হয়েছে
আল্লাহ চেয়েছেন যে, মানুষ নিজেরাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুক।
"তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি (খলিফা) করেছেন..." (সূরা ফাতির ৩৫:৩৯)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, মানুষকে পৃথিবীতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য পাঠানো হয়েছে।
আমাদের করণীয় কী?
যদি শিশুদের নির্যাতন হয়, তাহলে আমাদের কাজ হলো:
১. অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো: শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করলেই হবে না; আমাদেরও ব্যবস্থা নিতে হবে (সূরা আন-নিসা ৪:৭৫)।
2. দোয়া করা: নির্যাতিতদের জন্য দোয়া করা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো (সহিহ বুখারি)।
3. সচেতনতা তৈরি করা: সমাজের অন্যায় প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা।
4. আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া: অন্যায়কারীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
আল্লাহ সব দেখেন, শোনেন, এবং তিনি সবকিছুর খবর রাখেন। দুনিয়াতে শিশুদের নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে, আল্লাহ উদাসীন। তিনি আমাদের পরীক্ষা করছেন—আমরা কীভাবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, তা দেখছেন।
- দুনিয়াতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
- আখিরাতে আল্লাহ চূড়ান্ত ন্যায়বিচার করবেন।
- ধৈর্য ও ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করা ঈমানের পরীক্ষা।
আমাদের উচিত, নিজেদের দায়িত্ব পালন করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, যাতে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
Comments
Post a Comment