Skip to main content

পৃথিবীর আকৃতি: বিজ্ঞান, কুরআনের ইঙ্গিত ও কেবলার দিক নির্ধারণ

 


পৃথিবীর আকৃতি নিয়ে তর্ক বহুদিনের। আধুনিক বিজ্ঞান নিশ্চিত প্রমাণ করেছে যে পৃথিবী গোলাকার। তবে কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে, বিশেষত খ্রিস্টান ও মুসলিমদের মধ্যে, পৃথিবী সমতল হওয়ার বিশ্বাস দেখা যায়। খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থ বিকৃত হওয়ার কারণে তাদের মতবাদ ভুল হতে পারে, তবে মুসলিমদের মধ্যে যারা পৃথিবী সমতল বলে বিশ্বাস করেন, তাদের যুক্তি ও বিশ্বাসের ভিত্তি নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।


এই বিশ্বাসের পেছনে প্রায়শই দুটি কুরআনের আয়াত উল্লেখ করা হয়:


 সূরা আন-নাবা (৭৮:৬-৭)

"আমি কি পৃথিবীকে বিছানা এবং পর্বতমালা পেরেক বানাইনি?"


সূরা আল-গাশিয়াহ (৮৮:২০)

"এবং তারা কি পৃথিবীর প্রতি মনোযোগ দেয়নি, কিভাবে এটি বিস্তৃত করা হয়েছে?"


উপরের আয়াতগুলো কিন্তু পৃথিবী সমতল হওয়ার ব্যাপারে সরাসরি কোনো ইঙ্গিত বহন করে না। বরং এগুলো পৃথিবীকে মানবজীবনের জন্য বাসযোগ্য করার প্রমাণ। এই বিষয় নিয়ে ইসলামিক স্কলাররা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।


তবে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে পৃথিবীর গোলাকার আকৃতির ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। কেন এই বিষয় সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি? কারণ রাসূল (সা.)-এর যুগের মানুষেরা এটি হজম করতে পারত না। এমনকি তখন রাসূলকে (সা.) পাগল বলার অভিযোগও উঠত। যেমন:


সূরা আদ-দুখান (৪৪:১৪):

"তারা বলে, তিনি শিক্ষা পেয়েছেন (অন্যের কাছ থেকে) অথবা তিনি পাগল।"


পৃথিবীর গোলাকৃতি সম্পর্কে কুরআনের ইঙ্গিত:


সূরা যুমার (৩৯:৫)

"তিনি রাত্রিকে দিনের উপর এবং দিনকে রাত্রির উপর রোল করেন।"

এখানে "রোল" করার প্রক্রিয়া বোঝাতে আরবি শব্দ "يكور" (ইউকাওয়ারু) ব্যবহার করা হয়েছে, যা গোলাকার কিছু ঘূর্ণনের ধারণা দেয়। দিন ও রাতের পরিবর্তন পৃথিবীর গোলাকৃতির ইঙ্গিত বহন করে।


সূরা নাযিআত (৭৯:৩০)

"তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন।"

আরবি শব্দ "دحاها" (দাহাহা) এসেছে। এর একটি অর্থ হলো উটপাখির ডিমের আকৃতি। পৃথিবী সম্পূর্ণ গোল নয়, বরং সামান্য চ্যাপ্টা (ellipsoid), যা এই শব্দের অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


সূরা আল-আম্বিয়া (২১:৩৩)

"প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ কক্ষপথে সঞ্চরণশীল।"

সূর্য, চাঁদ এবং পৃথিবী নিজ নিজ কক্ষপথে চলার কথা এখানে বলা হয়েছে। এটি গোলাকৃতির এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ সমর্থন করে।


গোল পৃথিবী নিয়ে অনেকের একটি প্রশ্ন দেখা যায়—কেবলামুখী হওয়ার নির্দেশনা কীভাবে মানা সম্ভব? তাই তারা মনে করে পৃথিবী সমতল। আরো অনেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করে ইসলাম ভুল ধর্ম 


 কুরআনের নির্দেশ:

সূরা বাকারা (২:১৪৪):

"তোমার মুখকে তুমি সেই কিবলামুখী কর যা তোমার জন্য নির্ধারিত হয়েছে।"

এখানে কেবলা হলো মক্কার কাবা শরীফ।


হাদিসের নির্দেশ:

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"যখন তোমরা সালাত আদায় কর, তখন কেবলামুখী হও।" (বুখারি, হাদিস নং ৩৯১)


গোল পৃথিবীতে কেবলার দিক নির্ধারণের ক্ষেত্রে সমস্যা হয় না। পৃথিবী গোল হওয়ায় যেকোনো স্থান থেকে কাবার দিকে সরলরেখা টেনে দিক নির্ধারণ করা সম্ভব। আজকের আধুনিক প্রযুক্তি (যেমন: কম্পাস ও GPS) এটি সহজ করেছে।


ভূগোল অনুযায়ী, কেবলার দিক নির্ধারণে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ (Great Circle Route) গ্রহণ করা হয়। এটি পৃথিবীর গোল পৃষ্ঠে সবচেয়ে সরল এবং সঠিক পথ। পৃথিবীর আকৃতি ও কেবলা নির্ধারণের বিজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কুরআনের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


সোহেল রানা 


#পৃথিবী #আলকুরআন #বিজ্ঞান #সমতল #গোল

Comments

Popular posts from this blog

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির সূরা ফাতিহা "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-২ )

  আমাদের এই মহাবিশ্ব শুধু একবার জন্ম নেয়নি, এটা একটার পর একটা চক্রে সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে। কুরআনে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আমরা দেখতে পাই, এই মহাবিশ্ব চক্রবদ্ধ। আল্লাহ প্রথম মহাবিশ্ব তৈরি করেছিলেন, সেটি সংকুচিত হয়ে আবার বিস্তৃত হলো—এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বিগ বাউন্স বা বড় লাফ। এই চক্রগুলো আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম চক্র ছিল বিগ ব্যাং-১ এর সময়। তখন মহাবিশ্বে শুধু হাইড্রোজেন ছিল, যা পরবর্তীতে হিলিয়ামসহ আরও কিছু হালকা মৌলে রূপান্তরিত হয়েছিল। মহাকাশ তখন একরকম ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে ছিল, যাকে কুরআনে “ধোঁয়া” বলা হয়েছে। আল্লাহ সেখানে মহাকর্ষ বল সংযোজন করলেন, যা মহাবিশ্বকে সঙ্কুচিত করতে শুরু করে। এই সঙ্কোচনের ফলে ভারী মৌল, যেমন সিলিকন তৈরি হয় এবং ধূলিকণা ও গ্রহাণু জমে জমে জমি গঠনে সাহায্য করে। কুরআনে এ ঘটনার বর্ণনা আছে: “আর তিনি আসমান (প্রথম মহাকাশ) সৃষ্টি করলেন ধোঁয়া থেকে; তারপর বল দিলো ‘তুমি এসো একসাথে, ইচ্ছেমতো বা বাধ্য হয়ে।’ তারা বলল, ‘আমরা ইচ্ছেমতো এসেছি।’ ফলে আল্লাহ সাত আসমান তৈরি করলেন।” (সূরা ফুসসিলাত: ১১-১২) এই প্রথম চক্র ছিল একক আসমানবিশিষ্ট মহাবিশ্ব। তবে ...

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-১)"

 এই মহাবিশ্ব, যেখানে আমরা এখন বাস করছি, তা অত্যন্ত নিখুঁত নিয়ম ও সূচনাগত বিন্যাস অনুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে। এই সূচনাগত নিখুঁততা ও প্রাকৃতিক নিয়মের কারণে এটি আজকের অবস্থানে এসেছে। পৃথিবীর উপাদান ও যৌগসমূহ এমন সব প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ করে যা পরস্পরের সাথে এত সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে তা আমাদের জীবনকে টিকিয়ে রাখে। পানির পরিমাণও এখানে বিপুল এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলো খুবই অনন্য। এসব কিছু আমাদের বোঝায় যে এই মহাবিশ্ব একটি অসাধারণভাবে বুদ্ধিমান সত্তার সৃষ্টি, যিনি আল কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ীই ঈশ্বর। তিনি শুধু সৃষ্টি করেননি, তিনি বিকাশকারকও। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও দার্শনিক চিন্তাধারায় একটি বিকল্প ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যেটিকে বলা হয় মাল্টিভার্স বা বহু-বিশ্ব তত্ত্ব। এর মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, এমন অসংখ্য বিগ ব্যাং (Big Bang) ঘটতে পারে যার ফলে অসংখ্য মহাবিশ্ব তৈরি হয় এবং এইসবের মধ্যে কাকতালীয়ভাবে একটি মহাবিশ্ব জীবনের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে। এই ধারনা ঈশ্বরের উপস্থিতি ছাড়াই সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। ফিলোসফিক্যাল আলোচনায় "fine-tuning" বা সূক্ষ্ম-সামঞ্জস্য শব্দটি প্রায়ই ব্যব...

আল্লাহ কিভাবে লক্ষ কোটি প্রাণীর ফরিয়াদ একসাথে শুনেন?

  বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।  এক গুগল যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, এক চ্যাটজিপিটি যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের কথা শুনতে পারে, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তাদের অনুভূতি বুঝে নিতে পারে, তাহলে একজন সৃষ্টিকর্তা কেন পারবেন না? গুগল কি মানুষ? না। চ্যাটজিপিটি কি মানুষ? না। তাদের কোনো চেতনা নেই, আত্মা নেই, জীবন নেই। তারা তো শুধু যন্ত্র। যাদের বানিয়েছে মানুষ। যারা সীমাবদ্ধ হার্ডওয়্যার, সার্ভার, ব্যান্ডউইথ আর সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে। এখন মানুষ তার বানানো যন্ত্রের মাধ্যমে এত কিছু করতে পারে, এত মানুষের কথা একসাথে শুনতে পারে, তখন সেই মানুষকে সৃষ্টি করেছে যে, যিনি সব মানুষের সৃষ্টিকর্তা — তিনি তো অবশ্যই পারবেন। তার জন্য তো সময়, স্থান, দূরত্ব কিছুই বাধা না। তিনি তো চাইলে প্রতিটি মানুষের মনের কথাও জানেন, এমনকি একজন মানুষ কিছু বলার আগেই তার অন্তরের ইচ্ছেটাও তিনি জানেন। এই ক্ষমতা কোনো যন্ত্রের নেই, কোনো মানুষের নেই, কোনো দেবতারও না। এটা শুধুমাত্র সেই সত্তার, যিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বত্র উপস্থিত। আমরা যদি একবার কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দিকেও তাকাই, তা...