Skip to main content

ইসরাইলের শক্তির মূল ভিত্তি আমেরিকা: ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

 


ইসরাইলের অস্তিত্ব ও শক্তির প্রধান ভিত্তি হলো আমেরিকা। যদি আমেরিকা ইসরাইলের পেছন থেকে সরে যায়, তবে ইসরাইল টিকে থাকতে পারবে না। তবে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক নয়; এর পেছনে গভীর ধর্মীয় কারণও রয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ ইয়াহুদিদের দুনিয়ার বুকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো, তারা প্রাচীনকাল থেকেই এক স্রষ্টার ইবাদত করে আসছে।


আমেরিকা বিশেষ করে তাদের প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টান সম্প্রদায়, ধর্মীয় কারণে ইসরাইলকে সাহায্য করে। কারণ তাদের বিশ্বাস, থার্ড টেম্পল (তৃতীয় মন্দির) পুনর্নির্মাণ না হলে জেসাস (ঈসা আ.) পুনরায় আসবেন না। এছাড়া, অনেক আমেরিকান খ্রিস্টান মনে করেন, ইয়াহুদিরা জেসাসের ভাই বা আত্মীয় এবং তাদের সাহায্য করাও একপ্রকার ধর্মীয় জিহাদ।


এই প্রবন্ধে আমরা ইসরাইলের শক্তির মূল ভিত্তি, আমেরিকার সমর্থনের কারণ এবং এর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বিশদভাবে আলোচনা করব।


আমেরিকার সমর্থন ছাড়া ইসরাইল টিকে থাকতে পারবে না


ইসরাইলের সামরিক শক্তি ও মার্কিন সহায়তা


ইসরাইলের অস্তিত্ব ও সামরিক ক্ষমতা আমেরিকার সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। আমেরিকা প্রতিবছর বিলিয়ন ডলারের সামরিক সাহায্য দেয়, যা ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:


২০২৩ সালে আমেরিকা ইসরাইলকে ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে।


ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Iron Dome) আমেরিকার সহায়তায় পরিচালিত হয়।


যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া ইসরাইলের সামরিক শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।



এই কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, যদি আমেরিকা ইসরাইলের সমর্থন বন্ধ করে দেয়, তবে ইসরাইলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

কুরআনে ইয়াহুদিদের শ্রেষ্ঠত্বের কথা


ইসলামে ইয়াহুদিদের সম্পর্কে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। কুরআনে আল্লাহ বলেন,


> “হে বনী-ইসরাঈল! আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি সমস্ত বিশ্বের ওপর।”

(সূরা আল-বাকারাহ 2:47)

এখানে বোঝা যায়, এক সময় ইয়াহুদিদেরকে আল্লাহ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিলেন। তবে এর কারণ তাদের এক স্রষ্টার উপাসনা করা এবং নবীদের বংশধর হওয়া। কিন্তু পরবর্তীতে তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করায় তাদের প্রতি গজব নেমে আসে।


কেন আমেরিকা ইসরাইলকে সাহায্য করে?


আমেরিকার ইসরাইলকে সাহায্য করার প্রধান দুটি কারণ রয়েছে:


১. ধর্মীয় কারণ


প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে, যদি ইসরাইলে তৃতীয় মন্দির (থার্ড টেম্পল) পুনর্নির্মাণ করা না হয়, তবে জেসাস (ঈসা আ.) পুনরায় আসবেন না। বাইবেলে বলা হয়েছে:


> “যখন জেরুজালেমের মন্দির পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে, তখনই ঈশ্বরের রাজত্ব শুরু হবে।”

(Book of Revelation 11:1-2)

এ কারণে আমেরিকার ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো ইসরাইলকে সর্বাত্মক সমর্থন দেয়।


২. ইয়াহুদিদের প্রতি খ্রিস্টানদের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি

প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টানদের একটি বড় অংশ মনে করে, ইয়াহুদিরা জেসাসের ভাই বা আত্মীয়স্বরূপ। তাদের বিশ্বাস, ইহুদিদের সাহায্য করা মানে একপ্রকার ধর্মীয় কর্তব্য পালন করা। অনেক খ্রিস্টান নেতা বলেন,


> “ইসরাইলের প্রতি আমাদের সমর্থন ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ।”

এর ফলে আমেরিকার নীতিনির্ধারকরা ইসরাইলের প্রতি বিশেষ সহানুভূতি প্রদর্শন করেন এবং রাজনৈতিকভাবে তাদের সাহায্য করেন।

থার্ড টেম্পল ও জেসাসের পুনরাগমন


ইসরাইল বর্তমানে আল-আকসা মসজিদের স্থানে তৃতীয় মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা করছে, যা মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি স্পর্শকাতর বিষয়।


প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী,


> “যখন ইসরাইলে থার্ড টেম্পল নির্মাণ হবে, তখনই শেষ যুগের সূচনা হবে এবং জেসাস পুনরায় আসবেন।”

এ কারণেই আমেরিকার অনেক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠন ইসরাইলকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে। 

ইসরাইলের অস্তিত্ব মূলত আমেরিকার সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা ছাড়া ইসরাইলের টিকে থাকা কঠিন। তবে এর পেছনে শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থ নয়, বরং গভীর ধর্মীয় কারণও কাজ করছে।

আমেরিকার প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে, ইসরাইলের টিকে থাকা ও থার্ড টেম্পল নির্মাণের সঙ্গে তাদের ধর্মীয় ভবিষ্যৎ জড়িত। তারা মনে করে, ইয়াহুদিদের সাহায্য করা একপ্রকার ধর্মীয় যুদ্ধ বা জিহাদ।

অতএব, ইসরাইল ও আমেরিকার সম্পর্ক শুধু রাজনীতি নয়, বরং এটি একটি ধর্মীয় মিশনের অংশ। যদি আমেরিকা কখনো তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে, তবে ইসরাইলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।


Comments

Popular posts from this blog

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির সূরা ফাতিহা "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-২ )

  আমাদের এই মহাবিশ্ব শুধু একবার জন্ম নেয়নি, এটা একটার পর একটা চক্রে সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে। কুরআনে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আমরা দেখতে পাই, এই মহাবিশ্ব চক্রবদ্ধ। আল্লাহ প্রথম মহাবিশ্ব তৈরি করেছিলেন, সেটি সংকুচিত হয়ে আবার বিস্তৃত হলো—এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বিগ বাউন্স বা বড় লাফ। এই চক্রগুলো আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম চক্র ছিল বিগ ব্যাং-১ এর সময়। তখন মহাবিশ্বে শুধু হাইড্রোজেন ছিল, যা পরবর্তীতে হিলিয়ামসহ আরও কিছু হালকা মৌলে রূপান্তরিত হয়েছিল। মহাকাশ তখন একরকম ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে ছিল, যাকে কুরআনে “ধোঁয়া” বলা হয়েছে। আল্লাহ সেখানে মহাকর্ষ বল সংযোজন করলেন, যা মহাবিশ্বকে সঙ্কুচিত করতে শুরু করে। এই সঙ্কোচনের ফলে ভারী মৌল, যেমন সিলিকন তৈরি হয় এবং ধূলিকণা ও গ্রহাণু জমে জমে জমি গঠনে সাহায্য করে। কুরআনে এ ঘটনার বর্ণনা আছে: “আর তিনি আসমান (প্রথম মহাকাশ) সৃষ্টি করলেন ধোঁয়া থেকে; তারপর বল দিলো ‘তুমি এসো একসাথে, ইচ্ছেমতো বা বাধ্য হয়ে।’ তারা বলল, ‘আমরা ইচ্ছেমতো এসেছি।’ ফলে আল্লাহ সাত আসমান তৈরি করলেন।” (সূরা ফুসসিলাত: ১১-১২) এই প্রথম চক্র ছিল একক আসমানবিশিষ্ট মহাবিশ্ব। তবে ...

জাকারিয়া কামাল এর তাফসির "আল-আলামিন ও মহাবিশ্ব: কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (পর্ব-১)"

 এই মহাবিশ্ব, যেখানে আমরা এখন বাস করছি, তা অত্যন্ত নিখুঁত নিয়ম ও সূচনাগত বিন্যাস অনুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে। এই সূচনাগত নিখুঁততা ও প্রাকৃতিক নিয়মের কারণে এটি আজকের অবস্থানে এসেছে। পৃথিবীর উপাদান ও যৌগসমূহ এমন সব প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ করে যা পরস্পরের সাথে এত সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে তা আমাদের জীবনকে টিকিয়ে রাখে। পানির পরিমাণও এখানে বিপুল এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলো খুবই অনন্য। এসব কিছু আমাদের বোঝায় যে এই মহাবিশ্ব একটি অসাধারণভাবে বুদ্ধিমান সত্তার সৃষ্টি, যিনি আল কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ীই ঈশ্বর। তিনি শুধু সৃষ্টি করেননি, তিনি বিকাশকারকও। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও দার্শনিক চিন্তাধারায় একটি বিকল্প ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যেটিকে বলা হয় মাল্টিভার্স বা বহু-বিশ্ব তত্ত্ব। এর মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, এমন অসংখ্য বিগ ব্যাং (Big Bang) ঘটতে পারে যার ফলে অসংখ্য মহাবিশ্ব তৈরি হয় এবং এইসবের মধ্যে কাকতালীয়ভাবে একটি মহাবিশ্ব জীবনের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে। এই ধারনা ঈশ্বরের উপস্থিতি ছাড়াই সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। ফিলোসফিক্যাল আলোচনায় "fine-tuning" বা সূক্ষ্ম-সামঞ্জস্য শব্দটি প্রায়ই ব্যব...

আল্লাহ কিভাবে লক্ষ কোটি প্রাণীর ফরিয়াদ একসাথে শুনেন?

  বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।  এক গুগল যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, এক চ্যাটজিপিটি যদি একই সময়ে কোটি কোটি মানুষের কথা শুনতে পারে, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তাদের অনুভূতি বুঝে নিতে পারে, তাহলে একজন সৃষ্টিকর্তা কেন পারবেন না? গুগল কি মানুষ? না। চ্যাটজিপিটি কি মানুষ? না। তাদের কোনো চেতনা নেই, আত্মা নেই, জীবন নেই। তারা তো শুধু যন্ত্র। যাদের বানিয়েছে মানুষ। যারা সীমাবদ্ধ হার্ডওয়্যার, সার্ভার, ব্যান্ডউইথ আর সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে। এখন মানুষ তার বানানো যন্ত্রের মাধ্যমে এত কিছু করতে পারে, এত মানুষের কথা একসাথে শুনতে পারে, তখন সেই মানুষকে সৃষ্টি করেছে যে, যিনি সব মানুষের সৃষ্টিকর্তা — তিনি তো অবশ্যই পারবেন। তার জন্য তো সময়, স্থান, দূরত্ব কিছুই বাধা না। তিনি তো চাইলে প্রতিটি মানুষের মনের কথাও জানেন, এমনকি একজন মানুষ কিছু বলার আগেই তার অন্তরের ইচ্ছেটাও তিনি জানেন। এই ক্ষমতা কোনো যন্ত্রের নেই, কোনো মানুষের নেই, কোনো দেবতারও না। এটা শুধুমাত্র সেই সত্তার, যিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বত্র উপস্থিত। আমরা যদি একবার কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দিকেও তাকাই, তা...